দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই: যে বই আপনার ভিতরের কিশোরকে জাগিয়ে তুলবে
Books you should read before college
Editorial Team১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:৪৮ PM১ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

ভূমিকা: যে বই কখনো বড় হতে দেয় না
কলেজে পা রাখার আগে আপনি যদি একটি বই পড়তে চান যা আপনাকে দেখাবে—বড় হওয়াটা আসলে কেমন লাগে, আর কেন কখনো কখনো আমরা বড় হতে চাই না—তাহলে সেটি হলো জে. ডি. সালিঞ্জারের ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি কোনো সাধারণ কিশোর গল্প নয়। এটি একটি আবেগের ঝড়, একটি পরিচয়ের সন্ধান, এবং একটি অস্বস্তিকর সত্যের আয়না।
বইটি প্রকাশের পরপরই আমেরিকায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেকে এটিকে "অশ্লীল" বলে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান, আবার অনেকে এটিকে বিংশ শতাব্দীর সেরা আমেরিকান উপন্যাস বলে অভিহিত করেন। এখন পর্যন্ত এটি ৭৫ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে এবং বিশ্বের বহু দেশের স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একজন সমালোচক লিখেছেন, এই বইটি "প্রথম যে বইটি কিশোররা ভালোবাসে"—এটি সেই বই যা প্রথমবার তাদের কাছে সাহিত্যের সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
গল্প: তিন দিনের এক অনিশ্চিত যাত্রা
গল্পের কেন্দ্রে হোল্ডেন কাউলফিল্ড—একটি ষোলো বছরের ছেলে, যে সম্প্রতি পেনসি প্রিপ স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। সে জানে তার বাবা-মা তাকে আবার অন্য স্কুলে ভর্তি করবেন, কিন্তু সে সেই স্কুলে যেতে চায় না। বড়দিনের ছুটি শুরু হতে এখনো কয়েকদিন বাকি, তাই সে বাড়ি না গিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরে ঘুরতে থাকে।
সেই তিনদিনে হোল্ডেন কী করে? সে হোটেলে ওঠে, বারে যায়, সিনেমা দেখে, পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করে, এমনকি এক পতিতাকে ডেকে আনে—কিন্তু তার সাথে কথা বলে, শারীরিক সম্পর্ক করে না। সে পান করে, ক্লান্ত হয়, একাকী বোধ করে। সে সেন্ট্রাল পার্কে যায় এবং ভাবে—শীতে হ্রদের বরফ জমে গেলে হাঁসগুলো কোথায় যায়?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে যখন সে তার দশ বছরের বোন ফিবি-র সাথে দেখা করে। ফিবি তাকে জিজ্ঞেস করে—সে বড় হয়ে কী হতে চায়। হোল্ডেন উত্তর দেয় তার সেই স্বপ্নের কথা: সে রাই ফিল্ডে দাঁড়িয়ে থাকবে, যেখানে হাজারো ছোট বাচ্চা খেলছে, আর কেউ যদি ক্লিফ থেকে পড়ে যাওয়ার মতো হয়, সে ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেলবে। সে হবে "দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই"—রাইক্ষেতের রক্ষক।
কিন্তু শেষে দেখা যায়, হোল্ডেন নিজেই ভেঙে পড়েছে। তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়েছে, আর সেখান থেকেই সে তার এই তিনদিনের গল্প বলছে।
মূল থিম: যা আপনাকে ভাবাবে
প্রথমত, "ফনি" বা ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। হোল্ডেনের সবচেয়ে প্রিয় শব্দ হলো "ফনি" (Phony)—অর্থাৎ যারা ভণ্ড, যারা আসলে যা নয় তা হওয়ার ভান করে। সে তার স্কুলের হেডমাস্টারকে ঘৃণা করে, যে অভিভাবকদের সাথে কথা বলে তাদের টাকার ব্যাগ দেখে; সে তার রুমমেট স্ট্র্যাডলেটারকে ঘৃণা করে, যে মেয়েদের সাথে ব্যবহার করে; সে সিনেমার অভিনেতাদের ঘৃণা করে, যারা নকল আবেগ দেখায়। হোল্ডেনকে দেখে দুই ভাগে—নির্দোষ এবং ভণ্ড। এই দুই ভাগে ভাগ করার প্রবণতাই তার কিশোর মানসিকতার পরিচয়।
দ্বিতীয়ত, নির্দোষতা রক্ষার আকাঙ্ক্ষা। হোল্ডেন ছোট বাচ্চাদের ভালোবাসে। সে তার মৃত ভাই অ্যালি-কে আদর্শ করে, যে মাত্র এগারো বছর বয়সে লিউকেমিয়ায় মারা যায়। সে ফিবিকে রক্ষা করতে চায়। সে চায়—সব বাচ্চা চিরকাল বাচ্চা থাকুক, কেউ বড় না হোক, কারণ বড় হওয়া মানে ফনি হয়ে যাওয়া। কিন্তু সে নিজেই বুঝতে শুরু করে—সে সবাইকে বাঁচাতে পারবে না। কারোসেলের দৃশ্যে সে ফিবিকে গোল্ড রিং ধরতে দেয়, কিছু বলে না। কারণ সে জানে—"যদি তারা পড়ে যায়, তারা পড়ে যায়। কিন্তু কিছু বলা খারাপ।"
তৃতীয়ত, বড় হওয়ার ভয় এবং মৃত্যুর সাথে সম্পর্ক। গবেষকরা দেখেছেন—হোল্ডেনের বড় হওয়ার ভয় আসলে মৃত্যুর ভয়ের সাথে জড়িত। তার ভাই অ্যালির মৃত্যু তাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সে মনে করে—বড় হওয়া মানে সেই নির্দোষতা হারানো, যা অ্যালির মৃত্যুতে হারিয়েছে। তাই সে বড় হতে চায় না, দায়িত্ব নিতে চায় না, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে চায় না।
চতুর্থত, একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা। হোল্ডেন চারপাশে মানুষ দিয়ে ঘেরা, তবু সে সম্পূর্ণ একা। সে কারো সাথে সত্যিকারভাবে সংযোগ করতে পারে না। সে বারবার চেষ্টা করে—কিন্তু প্রতিবার ব্যর্থ হয়। এই বিচ্ছিন্নতাই তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
কেন এই বই কলেজের আগে পড়া উচিত
কলেজে পা রাখার আগে আপনি হয়তো ভাবছেন—আমি কে? আমি কোথায় যাচ্ছি? কেন আমি অন্যদের মতো নই? হোল্ডেন কাউলফিল্ডের গল্প আপনাকে দেখাবে—এই প্রশ্নগুলো একা আপনার নয়। প্রতিটি প্রজন্মের কিশোররা এই প্রশ্ন করে এসেছে। সালিঞ্জার ১৯৫১ সালে যা লিখেছিলেন, তা আজও সত্য—কারণ কিশোর মনস্তত্ত্ব কখনো বদলায় না।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি আলোচনায় বলা হয়েছে—আজকের কিশোররা হয়তো হোল্ডেনের মতো "বিদ্রোহী" নয়, তারা হয়তো "অতিরিক্ত ভালো বাচ্চা" বা "সম্পূর্ণ বিপথগামী"—কিন্তু হোল্ডেনের ভিতরের সেই একাকীত্ব, সেই বিভ্রান্তি, সেই "আমি কোথাও মানাই না"—এই অনুভূতি আজও প্রতিটি কিশোরের ভিতরে কাজ করে। কলেজে আপনি প্রথমবার নিজের পরিচয় নিয়ে গভীরভাবে ভাববেন। হোল্ডেন আপনাকে দেখাবে—এই যাত্রা কঠিন, কিন্তু আপনি একা নন।
উপসংহার: যে বই আপনাকে মানুষ হতে শেখায়
দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই কেবল একটি কিশোর উপন্যাস নয়; এটি একটি আবেগের সংবিধান, একটি বড় হওয়ার ম্যানিফেস্টো। হোল্ডেন কাউলফিল্ড আমাদের শেখায়—বড় হওয়া মানে ভণ্ড হয়ে যাওয়া নয়। বড় হওয়া মানে নির্দোষতা হারানো নয়, বরং নির্দোষতাকে নিজের ভিতরে বাঁচিয়ে রাখা—যদিও ফনি(Phony)।
সালিঞ্জার এই একটি বই লিখে অমর হয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন—একজন কিশোরের ভিতরের ঝড়, তার ক্ষোভ, তার ভালোবাসা—এই সবকিছু সাহিত্যে রূপ দেওয়া সম্ভব। কলেজে পা রাখার আগে এই বইটি পড়ুন। হোল্ডেনের কণ্ঠস্বর আপনার মাথায় বাজবে—যখন আপনি ভিড়ের মধ্যে একা বোধ করবেন, যখন সবকিছুকে ফনি মনে হবে, যখন আপনি ভাববেন "আমি কোথাও মানাই না।" তখন মনে করবেন—হোল্ডেনও একা ছিল। কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত ফিবির কারোসেলের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শিখেছিল—কারণ সে বুঝেছিল, বাচ্চারা বড় হবে, পড়বে, উঠবে, আবার পড়বে। আর সে কেবল একজন রক্ষক হতে পারে না; সে কেবল একজন দর্শক হতে পারে—যে ভালোবাসে, যে কাঁদে, যে ছেড়ে দিতে শেখে।
পূর্ববর্তী
দ্য সাটল আর্ট অফ নট গিভিং আ এফ***: যে বই আপনাকে শেখাবে কী নিয়ে "চিন্তা করবেন না"
পরবর্তীদ্য অ্যালকেমিস্ট: যে বই আপনাকে শেখাবে নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করতে
সম্পর্কিত সংবাদ
খেলাধুলা ও বিনোদন
দ্য আর্ট অফ ওয়ার: যে বই আপনাকে শেখাবে জয়ের আগে প্রস্তুতির মূল্য
খেলাধুলা ও বিনোদন
টু কিল আ মকিংবার্ড: ক্যাম্পাসে পা রাখার আগে যে বইটি আপনাকে মানুষ করে তুলবে
খেলাধুলা ও বিনোদন
১৯৮৪: সত্য, স্বাধীনতা ও ক্ষমতার বিভীষিকাময় আয়না

খেলাধুলা ও বিনোদন
Educated: শিক্ষাই যেখানে হয়ে ওঠে মুক্তির অস্ত্র
খেলাধুলা ও বিনোদন
অ্যাটমিক হ্যাবিটস: ছোট ছোট অভ্যাস, বিশাল পরিবর্তনের গল্প

খেলাধুলা ও বিনোদন
ডিফাইনিং ডিকেড: বিশের কোঠা কেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশ বছর
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
