প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস: যে বই আপনাকে শেখাবে মানুষ পড়তে ও সমাজ বুঝতে
Books you should read before college
Editorial Team১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:২২ PM০ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:
ভূমিকা: যে বই দুইশত বছর ধরে পাঠকদের মুগ্ধ করে রেখেছে
কলেজে পা রাখার আগে আপনি যদি একটি বই পড়তে চান যা আপনাকে শেখাবে—মানুষ কীভাবে চিন্তা করে, সমাজ কীভাবে কাজ করে, আর কীভাবে সূক্ষ্ম ভাষায় সবচেয়ে ধারালো সমালোচনা করা যায়—তাহলে সেটি হলো জেন অস্টেনের 'প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস'। ১৮১৩ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি প্রথমে লেখকের নাম ছাড়াই প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু আজ, দুইশত বছর পরেও, এটি বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে প্রিয় ও সর্বাধিক পঠিত উপন্যাসগুলোর একটি। বিশ্বজুড়ে ২ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে, ৪০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এবং অসংখ্য চলচ্চিত্র, টেলিভিশন সিরিজ ও উপন্যাসের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
কেন একটি দুইশত বছরের পুরনো প্রেমের গল্প আজও এত প্রাসঙ্গিক? কারণ এটি কেবল প্রেমের গল্প নয়। এটি মানব স্বভাবের একটি নির্ভুল মানচিত্র, সামাজিক শ্রেণীর একটি ধারালো সমালোচনা, এবং ভাষার সৌন্দর্যের একটি অসামান্য উদাহরণ।
গল্প: এলিজাবেথ বেনেট ও মিস্টার ডার্সির যাত্রা
গল্পের কেন্দ্রে এলিজাবেথ বেনেট—পাঁচ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়, বুদ্ধিমতী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির, এবং স্বাধীনচেতা। তার মা চান মেয়েদের ধনী পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে। তার বাবা—বুদ্ধিমান কিন্তু উদাসীন—সবকিছুকে কৌতুকের চোখে দেখেন।
গল্পের শুরুতে মিস্টার বিংলি নামে এক ধনী তরুণ পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নেন। তিনি এলিজাবেথের বড় বোন জেন-এর প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু বিংলির বন্ধু মিস্টার ডার্সি—আরও ধনী, আরও অভিজাত, কিন্তু অহংকারী ও নিরুদ্দেশ—জেন ও বিংলির সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ান। এলিজাবেথ প্রথম দেখাতেই ডার্সিকে ঘৃণা করেন, কারণ তিনি একটি বল নাচে তাকে অপমান করেছিলেন।
কিন্তু গল্প এগোলে দেখা যায়—ডার্সি আসলে এলিজাবেথের প্রেমে পড়েছেন। তিনি প্রস্তাব দেন, কিন্তু এমনভাবে যা এলিজাবেথকে আরও ক্ষুব্ধ করে। এলিজাবেথ তাকে প্রত্যাখ্যান করেন—কেবল তার অহংকারের জন্য নয়, বরং মিস্টার উইকহাম নামে এক আকর্ষণীয় অফিসারের মিথ্যা অভিযোগে বিশ্বাস করে। উইকহাম দাবি করেন—ডার্সি তার উত্তরাধিকার কেড়ে নিয়েছেন।
পরে এলিজাবেথ আবিষ্কার করেন—তিনি ভুল ছিলেন। উইকহাম একজন প্রতারক, লোভী ও নৈতিকতাহীন। আর ডার্সি—যাকে তিনি অহংকারী ভেবেছিলেন—আসলে একজন সম্মানিত, উদার ও নীতিবান মানুষ, যে তার বন্ধুর সুখের জন্য, এলিজাবেথের পরিবারের সম্মানের জন্য নীরবে কাজ করেছেন।
এলিজাবেথের প্রাইড (অহংকার) ছিল তার নিজের বিচার ক্ষমতার ওপর অতি আস্থা। ডার্সির প্রেজুডিস (কুসংস্কার) ছিল তার শ্রেণীগত উচ্চতা। দুজনেই তাদের ভুল বুঝতে পারেন, নিজেদের সংশোধন করেন, এবং শেষে মিলিত হন।
মূল থিম: যা আপনাকে ভাবাবে
প্রথমত, প্রথম Impression কখনো সম্পূর্ণ সত্য নয়। বইটির প্রথম বাক্যেই অস্টেন লিখেছেন: "এটি একটি সর্বজনস্বীকৃত সত্য যে, একজন একক পুরুষ যখন যথেষ্ট সম্পদের মালিক হয়, তখন তার একটি স্ত্রী প্রয়োজন।" এই বাক্যটি বিদ্রূপ—কারণ বই দেখায়—বিবাহ কেবল সম্পদের লেনদেন নয়; এটি হৃদয়ের সিদ্ধান্ত। এলিজাবেথ ডার্সিকে প্রথম দেখে ঘৃণা করেন, কিন্তু পরে বুঝতে পারেন—প্রথম দেখার রায় ভুল ছিল। কলেজে আপনি মানুষকে প্রথম দেখায় বিচার করবেন—এই বই শেখাবে, একটু অপেক্ষা করুন, গভীরে দেখুন।
দ্বিতীয়ত, অহংকার ও কুসংস্কার উভয়ই বিপজ্জনক। এলিজাবেথের অহংকার হলো—সে ভাবে সে মানুষ বুঝতে পারে, কিন্তু তার বিচার ভুল হয়। ডার্সির কুসংস্কার হলো—সে শ্রেণীগত উচ্চতা থেকে নিচু শ্রেণীকে হেয় মনে করে। দুজনেই ভুল করে, দুজনেই শেখে। অস্টেন দেখান—আসল পরিপক্বতা হলো নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস।
তৃতীয়ত, সমাজের শ্রেণীবিভাগ ও নারীর অবস্থান। অস্টেনের যুগে নারীর একমাত্র লক্ষ্য ছিল ভালো বিয়ে। কিন্তু এলিজাবেথ সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে। সে বলে: "আমি কেবল সেই মানুষকেই বিয়ে করব যাকে আমি সত্যিই ভালোবাসি।" এই ঘোষণা সেই সময়ে ছিল বিপ্লব। কিন্তু অস্টেন দেখান—নারীর এই স্বাধীনতা কতটা সীমিত। এলিজাবেথের বন্ধু শার্লট লুকাস বিয়ে করেন মিস্টার কলিন্সকে—একজন নির্বোধ, আত্মমগ্ন পুরুষ—কারণ শার্লটের বয়স বাড়ছে, সম্পদ নেই, এবং বিয়ে না করলে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অস্টেন এখানে কোনো নৈতিক রায় দেন না; তিনি কেবল দেখান—বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর, আর নারীদের পছন্দ কতটা সীমিত।
চতুর্থত, ভাষার ধার ও বিদ্রূপ। অস্টেনের সবচেয়ে বড় দক্ষতা হলো—সূক্ষ্ম ভাষায় সবচেয়ে ধারালো সমালোচনা। তার বিদ্রূপ কখনো সরাসরি নয়; এটি একটি হাসি, একটি কথার প্যাঁচ, একটি বাক্যের ভাঁজে লুকানো। যখন মিস্টার কলিন্স এলিজাবেথকে প্রস্তাব দেন, তখন তার কথায় এত আত্মপ্রশংসা, এত হাস্যকর আত্মবিশ্বাস—যে পাঠক হাসতে হাসতে কাঁদবেন। এই ভাষার সৌন্দর্যই অস্টেনকে অমর করেছে।
কেন এই বই কলেজের আগে পড়া উচিত
কলেজে পা রাখার আগে আপনি হয়তো ভাবছেন—সোশ্যাল সিটুয়েশন, নতুন বন্ধু, রুমমেট, অধ্যাপক—সবাইকে কীভাবে বুঝব? প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস আপনাকে শেখাবে—মানুষ পড়তে শেখা মানে কেবল তাদের কথা শোনা নয়; তাদের নীরবতা, তাদের পছন্দ, তাদের পটভূমি—সবই পড়তে শেখা।
আরও একটি বিষয়—এই বইটি আপনাকে শেখাবে পড়ার দক্ষতা। অস্টেনের বাক্যগুলো দীর্ঘ, জটিল, স্তরে স্তরে সাজানো। তার প্রতিটি শব্দ সচেতনভাবে বাছাই করা। এই বই পড়লে আপনি শিখবেন—ধীরে পড়া, প্রতিটি বাক্য বুঝে পড়া, ভাষার সূক্ষ্মতা উপভোগ করা। যা কলেজে পাঠ্যবই পড়তে, গবেষণাপত্র বুঝতে, এমনকি পরীক্ষায় ভালো করতে সাহায্য করবে।
উপসংহার: যে বই আপনাকে মানুষ পড়তে শেখাবে
প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়; এটি মানব স্বভাবের একটি বিশ্বকোষ, সামাজিক শ্রেণীর একটি সমালোচনা, এবং ভাষার শিল্পের একটি অসামান্য উদাহরণ। জেন অস্টেন মাত্র ছয়টি উপন্যাস লিখে বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে গেছেন।
কলেজে পা রাখার আগে এই বইটি পড়ুন। এটি আপনাকে শেখাবে—মানুষকে বিচার করার আগে বুঝুন, বুঝতে শেখার আগে শুনুন, শোনার আগে নিজের অহংকার ও কুসংস্কার সম্পর্কে সচেতন হোন। আর আপনি আবিষ্কার করবেন—এলিজাবেথ ও ডার্সির গল্প আপনার নিজের গল্প। কারণ আমরা প্রত্যেকেই কখনো এলিজাবেথ—নিজের বিচারে অতি আত্মবিশ্বাসী; আবার কখনো ডার্সি—নিজের শ্রেষ্ঠত্বে অন্ধ। কিন্তু আমরা যদি শিখতে পারি, ক্ষমা করতে পারি, ভালোবাসতে পারি—তাহলেই আমরা সত্যিকারভাবে বড় হই।
অস্টেন শেষ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: "ডার্সি ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যাকে এলিজাবেথ সত্যিই ভালোবাসত।" আর সেই ভালোবাসা অহংকার ও কুসংস্কার জয় করে এসেছিল। আপনারও জয় হোক—নিজের অহংকার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।
পূর্ববর্তী
একশ বছরের নিঃসঙ্গতা: সময়, নিঃসঙ্গতা ও ভাগ্যের চক্রের এক মহাকাব্য
পরবর্তীফ্রাঙ্কেনস্টাইন: যে বই কলেজের আগে শেখাবে সৃষ্টির দায়িত্ব ও একাকীত্বের যন্ত্রণা
সম্পর্কিত সংবাদ
খেলাধুলা ও বিনোদন
টু কিল আ মকিংবার্ড: ক্যাম্পাসে পা রাখার আগে যে বইটি আপনাকে মানুষ করে তুলবে
খেলাধুলা ও বিনোদন
১৯৮৪: সত্য, স্বাধীনতা ও ক্ষমতার বিভীষিকাময় আয়না

খেলাধুলা ও বিনোদন
Educated: শিক্ষাই যেখানে হয়ে ওঠে মুক্তির অস্ত্র
খেলাধুলা ও বিনোদন
অ্যাটমিক হ্যাবিটস: ছোট ছোট অভ্যাস, বিশাল পরিবর্তনের গল্প

খেলাধুলা ও বিনোদন
ডিফাইনিং ডিকেড: বিশের কোঠা কেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশ বছর

খেলাধুলা ও বিনোদন
দ্য অ্যালকেমিস্ট: যে বই আপনাকে শেখাবে নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করতে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
