বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
বুদ্ধদেব বসু
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা শুধু নিজেদের লেখায় নয়, বরং চারপাশের সাহিত্য পরিবেশকেও বদলে দিয়েছেন। তাঁরা পত্রিকা প্রকাশ করেছেন, অন্যদের লেখাকে উৎসাহিত করেছেন, একটি প্রজন্মকে নতুন দিক দেখিয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রতিভা—একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গল্পকার, অনুবাদক, সম্পাদক ও সাহিত্য-সমালোচক । যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশাতেই তাঁর প্রভাবের বাইরে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন । যিনি বাংলা কবিতার নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন, সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করে একটি প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছিলেন । 'কবিতা' পত্রিকা ও 'কবিতাভবন'—এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন।
শৈশব ও শিক্ষা: কুমিল্লার মাটি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯০৮ সালের ৩০শে নভেম্বর তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন বুদ্ধদেব বসু । পিতা ভূদেব বসু ছিলেন ঢাকা বারের একজন উকিল । কিন্তু জন্মের মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মা বিনয়কুমারী ১৬ বছর বয়সে ধনুষ্টংকার রোগে মৃত্যুবরণ করেন । এই শোকে অভিভূত হয়ে পিতা সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে গৃহত্যাগ করেন । ফলে শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রথমভাগ কেটেছে মাতামহ চিন্তাহরণ সিংহ ও মাতামহী স্বর্ণলতা সিংহের কাছে—কুমিল্লা, নোয়াখালী আর ঢাকায় ।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯২৫ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পঞ্চম স্থান অর্জন করেন । ১৯২৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পাস করেন । এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান, ১৯৩০) ও স্নাতকোত্তর (১৯৩১) ডিগ্রি লাভ করেন ।
'প্রগতি' ও 'কবিতা': দুই পত্রিকা, দুই যুগ, এক মহাপরিকল্পনা
'প্রগতি' (১৯২৭-১৯২৯): ঢাকা থেকে শুরু
মাত্র ১৯ বছর বয়সে, ছাত্রজীবনেই, বুদ্ধদেব বসু শুরু করলেন তাঁর প্রথম সাহিত্য পত্রিকা 'প্রগতি' । ঢাকার ৪৭ পুরানা পল্টন থেকে প্রকাশিত হতো এই পত্রিকা । দশজন সমমনা বন্ধুকে নিয়ে তিনি প্রতি মাসে দশ টাকা করে চাঁদা তুলে পত্রিকা প্রকাশ করতেন ।
'প্রগতি'-র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল—তিনি জীবনানন্দ দাশের প্রথম দিকের কবিতা প্রকাশ করেছিলেন এবং এই প্রতিশ্রুতিশীল কবির প্রতি সাহিত্য মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অত্যন্ত প্রশংসাসূচক একটি প্রবন্ধও লিখেছিলেন । জীবনানন্দের প্রতি এই সমর্থন ছিল যুগান্তকারী, কারণ তখন তিনি ছিলেন অচেনা একজন কবি। প্রায় দুই বছর প্রকাশের পর ১৯২৯ সালে 'প্রগতি'-র শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ।
'কবিতা' (১৯৩৫-১৯৬০): বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পত্রিকা
১৯৩১ সালে ঢাকা থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত হওয়ার চার বছর পর, ১৯৩৫ সালের অক্টোবরে বুদ্ধদেব বসু শুরু করলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—'কবিতা' পত্রিকা ।
প্রথম দুই বছর পত্রিকাটি যৌথভাবে সম্পাদিত হতো প্রেমেন্দ্র মিত্র-এর সঙ্গে, সহকারী সম্পাদক ছিলেন সমর সেন । 'কবিতা'-র আদর্শ ছিল শিকাগো থেকে প্রকাশিত 'পোয়েট্রি' (Poetry) পত্রিকা, যা হ্যারিয়েট মনরো সম্পাদনা করতেন ।
এই পত্রিকার গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে মাত্র প্রথম সংখ্যা প্রকাশের পরই এডওয়ার্ড থম্পসন ১৯৩৬ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি 'টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট'-এ বাংলা কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে 'কবিতা'-র প্রথম সংখ্যার উল্লেখ করেছিলেন ।
'কবিতা' ১৯৬১ সালের মার্চ পর্যন্ত—প্রায় ২৫ বছর ধরে—প্রকাশিত হয়েছিল । রবীন্দ্রোত্তর কবিতা-আন্দোলনে এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম ।
'কবিতাভবন': যেখানে কবিতা ও কবিরা বাস করতেন
'কবিতাভবন' নামের বাড়ি
বুদ্ধদেব বসু ১৯৩৭ সালে কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের ২০২ নম্বর বাড়িতে উঠে আসেন । এই বাড়িটির নাম ছিল 'কবিতাভবন'। শুধু নামই নয়, এই বাড়িটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে কলকাতার সাহিত্য জগতের এক অনন্য মিলনস্থল—যেখানে নিয়মিত আসতেন কবি, ঔপন্যাসিক, পত্রিকা সম্পাদক, প্রকাশক, বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপকরা ।
'কবিতাভবন' প্রকাশনা সংস্থা
কলকাতায় এসে বুদ্ধদেব বুঝতে পারলেন যে বাংলা সাহিত্যে কবিতার বই প্রকাশ করতে আগ্রহী প্রকাশক খুব কমই আছেন । তাই তিনি নিজেই উদ্যোগ নিলেন। প্রথমে 'গ্রন্থকার মণ্ডলী' নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা চালু করলেন । পরে তাঁর প্রকাশিত সমস্ত বই 'কবিতাভবন' নামেই প্রকাশিত হতে থাকে ।
উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা:
এক পয়সায় একটি সিরিজ: ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি ১৬ পৃষ্ঠার, দাম মাত্র ১ টাকা (তখন ১৬ পয়সা) এমন ছোটো কবিতার বই প্রকাশ করেন । এই সিরিজে মোট ১৮টি বই প্রকাশিত হয়েছিল । জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন'-এর প্রথম সংস্করণ এই সিরিজেই প্রকাশিত হয়েছিল, যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বুদ্ধদেব নিজেই ।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বই: 'কবিতাভবন' থেকে প্রকাশিত হয়েছে বুদ্ধদেবের 'কঙ্কাবতী', সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'পদাতিক', সমর সেনের 'কয়েকটি কবিতা', অমিয় চক্রবর্তীর 'অভিজ্ঞান বসন্ত' ।
সাহিত্যকীর্তি: শতাধিক গ্রন্থের এক মহাসমুদ্র
বুদ্ধদেব বসু ছিলেন অত্যন্ত উৎপাদনশীল লেখক—শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি । সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় রয়েছে তাঁর অবদান:
কবিতা: তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'বন্দীর বন্দনা' (১৯৩০) । তারপর 'কঙ্কাবতী' (১৯৩৭) , 'দ্রৌপদীর শাড়ী' (১৯৪৮) , 'শীতের প্রার্থনা: বসন্তের উত্তর' (১৯৫৫) , 'যে অাঁধার আলোর অধিক' (১৯৫৮) , 'স্বাগত বিদায়' (১৯৭৪) —যার জন্য তিনি মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন ।
উপন্যাস: 'লাল মেঘ' (১৯৩৪) , 'সাড়া', 'কালো হাওয়া', 'তিথিডোর', 'রাতভর বৃষ্টি' (১৯৬৭) , 'পাতাল থেকে আলাপ' (১৯৬৭) , 'গোলাপ কেন কালো' (১৯৬৮) ।
ছোটগল্প: 'অভিনয়, অভিনয় নয়' (১৯৩০) , 'রেখাচিত্র' (১৯৩১) , 'ভাসো আমার ভেলা' (১৯৬৩) ।
নাটক: 'তাপস্বী ও তরঙ্গিণী' (১৯৬৬) —১৯৬৭ সালে এই নাটকের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন । 'কলকাতার ইলেকট্রা ও সত্যসন্ধা' (১৯৬৮
শক্তি চট্টোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা কবিতার বাউণ্ডুলে পুরোহিত
পরবর্তীসুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
শক্তি চট্টোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা কবিতার বাউণ্ডুলে পুরোহিত
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
