তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের যে স্বর্ণযুগে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের মতো দিকপালরা একের পর এক অমর সৃষ্টি রেখে গেছেন, তার ঠিক পরবর্তী প্রজন্মে আবির্ভূত হলেন এক অন্যরকম কথাশিল্পী। যাঁর কলমে ধরা পড়েছে রাঢ়বাংলার রুক্ষ মাটি, শুষ্ক গ্রাম, কঠোর পরিশ্রমী মানুষ আর তাদের জীবনের অকথিত গল্প। তিনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়—বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী ঔপন্যাসিক, যাঁকে অনেকে মনে করেন শরৎচন্দ্রের পর বাংলা কথাসাহিত্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জনকারী লেখক। যাঁর ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের জন্য তিনি পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, এবং যাঁর অসংখ্য রচনা বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে—সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ থেকে শুরু করে তপন সিংহের ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’—সবকিছুই তাঁর অমরত্বের প্রমাণ।
শৈশব ও শিক্ষা: পিতৃহারা ছেলেটির সংগ্রামী শুরু
১৮৯৮ সালের ২৩শে জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তারাশঙ্কর। পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা প্রভাবতী দেবী। মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহারা হন তিনি। এরপর বেড়ে ওঠেন মা প্রভাবতী দেবী ও বিধবা পিসিমা শৈলজা দেবীর কাছে।
১৯০৫ সালে বাংলা ভাগের আন্দোলনের সময় মাতুলের কাছ থেকে রাখি বেঁধে দেওয়ার ঘটনা তাঁর মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করে। ১৯১৬ সালে স্বগ্রামের যাদবলাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে আইএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু কলেজে পড়ার সময়ই মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
রাজনীতি ও কারাবাস: স্বাধীনতা আন্দোলনের সৈনিক
১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি প্রথম গৃহবন্দী হন। ১৯২৪ সালে বীরভূমের ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় এক বছর কারাবরণ করেন।
কারাগারে থাকাকালীন বাংলা কংগ্রেসের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষ করে তিনি হতাশ হন। ১৯৩১ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে রাজনীতি থেকে তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হননি—পরবর্তীতে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য (১৯৫২-৬০) এবং রাজ্যসভার সদস্য (১৯৬০-৬৬) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্যযাত্রা: ‘কল্লোল’ থেকে বিশ্বস্বীকৃতি
১৯২০-৩০-এর দশকে ‘কল্লোল’ পত্রিকা বাংলা সাহিত্যে যে নতুন আন্দোলনের সূচনা করেছিল, তার অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন তারাশঙ্কর। ১৯২৬ সালে ‘রসকলি’ গল্পের মাধ্যমে ‘কল্লোল’-এ তাঁর আত্মপ্রকাশ। এরপর ‘কালিকলম’, ‘বঙ্গশ্রী’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘প্রবাসী’, ‘পরিচয়’—প্রথম শ্রেণির সব পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে।
১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালি ঘূর্ণি’। এরপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে—‘পাষাণপুরী’ (১৯৩৩), ‘নীলকণ্ঠ’ (১৯৩৩), ‘রাইকমল’ (১৯৩৫)।
তিনি মোট ১৩১টি বই রচনা করেছেন—৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধগ্রন্থ, ৪টি আত্মজীবনী ও ২টি ভ্রমণকাহিনি।
সাহিত্যের ভুবন: রাঢ়বাংলার জীবন্ত দলিল
তারাশঙ্করের সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য ছিল বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের মাটি ও মানুষ। রাঢ়বাংলার রুক্ষভূমি, শ্রমজীবী কৃষক, মাঝি, গায়েন—এঁদের জীবনকে তিনি অপরিসীম মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সমালোচকেরা তাঁর ‘গণদেবতা’ (১৯৪২) ও ‘পঞ্চগ্রাম’ (১৯৪৪)-কে পল্লিজীবনের মহাকাব্য বলেছেন।
শ্রেষ্ঠ রচনাসমূহ
‘গণদেবতা’ (১৯৪২) — ময়ূরাক্ষী নদের তীরের এক গ্রামের কাহিনি, যেখানে জাতি ও শ্রেণি বিভাজনে পীড়িত মানুষের গল্প ফুটে উঠেছে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৬৬ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।
‘আরোগ্য নিকেতন’ (১৯৫৩) — গ্রামের একজন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসক ও একজন আধুনিক এমবিবিএস ডাক্তারের মধ্যে সংঘর্ষের কাহিনি। এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৫৫ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার ও ১৯৫৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’ (১৯৪৭) — কোপাই নদের তীরের মানুষের জীবন ও জমিদারি প্রথার বিরূপ প্রভাব নিয়ে রচিত। এই উপন্যাসের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শরৎ স্মৃতি স্বর্ণপদক প্রদান করে।
‘ধাত্রীদেবতা’ (১৯৩৯) — আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, যেখানে একজন জমিদার পরিবারের পতনের কাহিনি[f। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উপন্যাস নিয়ে তারাশঙ্করের সঙ্গে পত্রালাপ করেছিলেন এবং কিছু অংশে অসন্তোষ প্রকাশও করেছিলেন।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা: ‘কালিন্দী’ (১৯৪০), ‘কবি’ (১৯৪৪), ‘রাধা’ (১৯৫৬), ‘মন্বন্তর’, ‘সপ্তপদী’, ‘অভিযান’, ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
১৯৭১ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর কলকাতার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাহিত্যিক মহলে প্রচলিত আছে, ১৯৭১ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি পান পাবলো নেরুদা। তাঁর মৃত্যুর পর লাভপুরের পৈত্রিক বাড়িটি ২০২১ সালে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়।
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন
পরবর্তীআশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
শক্তি চট্টোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা কবিতার বাউণ্ডুলে পুরোহিত
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
