গাড়ি, বিমান, দেওয়াল—সবই যখন ব্যাটারি! কাঠামোগত ব্যাটারি কম্পোজিটের (Structural Battery Composites) বিপ্লব
Structural Battery Composites
কল্পনা করুন আপনার বৈদ্যুতিক গাড়ির বডি, দরজা, ছাদ—আর আলাদা করে কোনো ভারী ব্যাটারি প্যাক নেই। কল্পনা করুন একটা ড্রোন, যার ফ্রেমই বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখছে, আর সেই বিদ্যুতে সে উড়ছে বহু কিলোমিটার। কল্পনা করুন একটা বাড়ির দেওয়াল, যা সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে নিজের ভেতরেই সঞ্চয় করে রাখছে, আর রাতে সেই দেওয়ালই আপনার ঘরের বাতি জ্বালাচ্ছে। এগুলো কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্য নয়—এটাই স্ট্রাকচারাল ব্যাটারি কম্পোজিট (SBC) বা কাঠামোগত ব্যাটারি যৌগিক পদার্থ-এর বাস্তব প্রতিশ্রুতি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (World Economic Forum) এই প্রযুক্তিকে ২০২৫ সালের শীর্ষ ১০ উদীয়মান প্রযুক্তির তালিকায় স্থান দিয়েছে। কারণ, এটি শুধু একটি উন্নত ব্যাটারি নয়—এটি আমাদের ‘ডিজাইন’ বলতে যা বুঝি, তার পুরো ধারণাটাই পাল্টে দিতে পারে। চলুন, ঝটপট রোয়ারবাংলা স্টাইলে জেনে নেওয়া যাক—এই জাদুকরী উপাদানটা আসলে কী, কীভাবে কাজ করে, লাভ কী, বাধা কোথায়, আর ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী রাখছে।
ব্যাটারি আবার কাঠামো হয় কীভাবে?
সোজা কথায়, স্ট্রাকচারাল ব্যাটারি কম্পোজিট হলো সেই বিশেষ উপাদান, যা একইসঙ্গে দুটো কাজ করে: এটি যেমন বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে (ঠিক আপনার মোবাইলের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো), তেমনই এটি কাঠামোগত দৃঢ়তাও দেয়—অর্থাৎ, এটি ওজন বহন করতে পারে, বাঁকা কিংবা চাপ সহ্য করতে পারে, যা গাড়ির বডি বা বিমানের ডানার মতো জায়গায় প্রয়োজন।
এখানে মূল পার্থক্যটা বুঝতে হবে। সাধারণ ব্যাটারি সিস্টেমে ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল অংশগুলো (অ্যানোড, ক্যাথোড, ইলেকট্রোলাইট) একটা ভারী ধাতব কনটেইনারের ভেতর রাখা হয়। এই কনটেইনারটির ওজন বাড়ে, কিন্তু এটি কোনো কাঠামোগত কাজে আসে না—শুধু ব্যাটারিটাকে সুরক্ষিত রাখে। অন্যদিকে, SBC-তে সেই ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল অংশগুলোকেই এমনভাবে তৈরি করা হয় যে সেগুলো নিজেরাই শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে ব্যবহৃত হয় কার্বন ফাইবার, ইপোক্সি রেজিন, অথবা অন্যান্য হালকা ও উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন উপাদান। কার্বন ফাইবার তো ইস্পাতের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি শক্ত, কিন্তু ওজন মাত্র এক-পঞ্চমাংশ! এই উপাদানগুলিকে থ্রিডি প্রিন্টের মাধ্যমেও তৈরি করা যায়, আর বাড়তি পৃষ্ঠতল ও কাঠামোগত শক্তির জন্য ডিজাইন অপটিমাইজ করে দক্ষতা আরও বাড়ানো যায়।
ধারণাটি নতুন নয়—গত দুই দশক ধরে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, বিশেষ করে কম্পোজিট উপাদান, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও ইলেক্ট্রোকেমিস্ট্রির অগ্রগতির মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে রূপ পেয়েছে। ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোতে কিছু কিছু অংশে ব্যাটারি কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু SBC সেই ধারণাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাবে—যেখানে গাড়ির প্রতিটি শক্ত প্যানেল (দরজা, বনেট, ছাদ) বিদ্যুৎ সঞ্চয় করবে। এমনকি অ্যারোবাস (Airbus) ইতিমধ্যেই বিমানে SBC ব্যবহারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে! আর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারগুলো নতুন নতুন উপাদান ও পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে, যাতে এই প্রযুক্তি আরও কার্যকর হয়।
কেন এত চর্চা? লাভগুলো কী কী?
SBC-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—ওজন কমানো। আর হালকা মানেই কম শক্তি খরচ, বেশি রেঞ্জ, আর কম কার্বন নিঃসরণ। গবেষণা বলছে, গাড়ির ওজন ১০% কমালে জ্বালানি দক্ষতা ৬-৮% বাড়ে, আর ইলেকট্রিক গাড়ির রেঞ্জ বাড়ে ৭০% পর্যন্ত! শুধু তাই নয়, বিমানচালনার ক্ষেত্রে ১৫০০ কিলোমিটার ফ্লাইটে ১৫% পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। অর্থাৎ, SBC শুধু প্রযুক্তিগত উন্নতি নয়—এটি পুরো পরিবহণ শিল্পের ডিজাইন চিন্তাকে বদলে দেওয়ার হাতিয়ার।
সুবিধাগুলো একটু গুছিয়ে বলি:
১. ওজন কমায় অনেকখানি—যানবাহনের পুরো কাঠামো যখন ব্যাটারি, তখন আলাদা ব্যাটারি প্যাকের দরকার নেই। গাড়ি বা বিমান হালকা হয়, ফলে কম শক্তিতে বেশি দূরত্ব যায়।
২. জায়গা বাঁচে—ব্যাটারি রাখার জন্য আলাদা জায়গা রাখতে হয় না। সেই জায়গায় আরও যাত্রী বসাতে পারেন, বা আরও মালপত্র রাখতে পারেন। ডিজাইনাররা নতুন নতুন আকৃতি নিয়ে খেলতে পারেন, কারণ ব্যাটারি আর ‘আয়তাকার বাক্স’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
৩. নিরাপত্তা বাড়ে—এই কম্পোজিটে সাধারণত সলিড-স্টেট (কঠিন) ইলেকট্রোলাইট ব্যবহার করা হয়, ফলে তরল ইলেকট্রোলাইটের মতো আগুন লাগার বা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক কম। কার্বন ফাইবারের শক্ত কাঠামো দুর্ঘটনায় বাড়তি সুরক্ষাও দেয়।
৪. দ্রুত চার্জ হয়—কার্বন ফাইবারের বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা খুব ভালো, তাই আয়ন চলাচল দ্রুত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, SBC সাধারণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়ে দ্রুত চার্জ গ্রহণ করতে পারে।
৫. উৎপাদন খরচ কমানোর সম্ভাবনা—যদিও প্রাথমিক খরচ বেশি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আলাদা ব্যাটারি হাউজিং, কুলিং সিস্টেম, এবং অতিরিক্ত স্ট্রাকচারাল উপাদানের দরকার না পড়ায় খরচ কমতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নির্মাণ সামগ্রীর পরিমাণও কমাতে পারে, যা সম্পদের অপচয় রোধ করে।
৬. পরিবেশবান্ধব ডিজাইন—হালকা গাড়ি মানে কম জ্বালানি বা বিদ্যুৎ খরচ, মানে কম কার্বন নিঃসরণ। আর সঠিকভাবে তৈরি করলে এই উপাদানগুলো পুনঃব্যবহার, পুনঃপ্রয়োগ এবং পুনর্ব্যবহার (Reuse, Repurpose, Recycle) করা সহজ ও সস্তা হতে পারে।
আসল ‘জাদু’টা কীভাবে কাজ করে?
এই যৌগিক পদার্থের গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে এর মাল্টিলেয়ার গঠনে। সাধারণত SBC তৈরি করা হয় কার্বন ফাইবারের শিট দিয়ে, যার এক পাশ কাজ করে ব্যাটারির অ্যানোড (নেগেটিভ ইলেক্ট্রোড) হিসেবে। অন্যপাশে থাকে লিথিয়াম-আয়ন-লেপা কার্বন ফাইবার, যা ক্যাথোড (পজিটিভ ইলেক্ট্রোড) হিসেবে কাজ করে। দুই স্তরের মাঝখানে থাকে সলিড-স্টেট পলিমার ইলেকট্রোলাইট—যা আয়নগুলোকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে দেয়, কিন্তু শর্ট সার্কিট হতে দেয় না। আর এই পুরো স্যান্ডউইচের ভেতরে ইপোক্সি রেজিনের মতো বাইন্ডার থাকে, যা পুরো জিনিসটাকে শক্ত করে তোলে, বাঁকা বা চাপ সহ্য করার ক্ষমতা দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো—একটা উপাদান কীভাবে একইসঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চয় করবে আবার শক্তও থাকবে? উত্তরটা হলো কার্বন ফাইবারের বিশেষ গুণ। কার্বন ফাইবার যেমন পরিবাহী (বিদ্যুৎ চলাচল করতে পারে), তেমনই এটি অত্যন্ত শক্ত ও হালকা। গবেষকরা এখন কার্বন ফাইবারের বুনন, পুরুত্ব, এবং পৃষ্ঠতলের আকার নিয়ে খেলছেন, যাতে ব্যাটারি যেমন ভালো চার্জ ধরে, তেমনই প্রয়োজনীয় বলও সহ্য করতে পারে। থ্রিডি প্রিন্টিং ব্যবহার করে এই উপাদানগুলিকে জ্যামিতিকভাবে অপটিমাইজ করা যায়—যেমন মৌচাকের মতো গঠন (Honeycomb Structure) দিয়ে শক্তি বাড়ানো আবার ওজন কমানো।
ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো কোথায় কোথায়?
এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা সত্যিই অসীম। এরইমধ্যে গবেষকরা নানা ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ নিয়ে কাজ করছেন:
বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV)—গাড়ির দরজা, বনেট, ছাদ, এমনকি সিটের ফ্রেম পর্যন্ত ব্যাটারি হয়ে গেলে, আলাদা ভারী ব্যাটারি প্যাকের দরকার পড়ে না। এক চার্জে ৭০০-৮০০ কিলোমিটার চলা সম্ভব হবে খুব সহজেই। ইতিমধ্যে ভলভো, টেসলা—সব বড় কোম্পানিই এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে।
বিমান ও ড্রোন—বিমানের ডানা, ফিউজলেজ যখন ব্যাটারি, তখন ওজন কমে অনেক। অ্যারোবাস ইতিমধ্যেই SBC-র প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে। ড্রোনের ক্ষেত্রে উড়ার সময় বাড়বে কয়েকগুণ, যা দুর্যোগ উদ্ধার, পণ্য সরবরাহ, কৃষি জরিপে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
মহাকাশযান ও স্যাটেলাইট—মহাকাশে ওজন বাঁচানো মানেই খরচ বাঁচানো। স্যাটেলাইটের বডি যখন ব্যাটারি, তখন আরও বেশি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া যাবে।
পরিধেয় ইলেকট্রনিক্স—স্মার্টওয়াচ, ফিটনেস ব্যান্ড, এমনকি পোশাকের ফাইবারেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। আপনার জ্যাকেটই চার্জ হয়ে আপনার ফোন চার্জ দিতে পারে!
নির্মাণ শিল্প—বাড়ির দেওয়াল, সিলিং বা ছাদ যখন ব্যাটারি হিসেবে কাজ করবে, তখন সোলার প্যানেল থেকে দিনের বেলা জমানো বিদ্যুৎ রাতে সেই দেওয়ালেই সঞ্চিত থাকবে। আলাদা ব্যাটারি ঘরের দরকার নেই। ভবনগুলো তখন শুধু আশ্রয় নয়, সক্রিয় শক্তি ব্যবস্থায় পরিণত হবে।
বাস্তব চ্যালেঞ্জ: কেন এখনও সবাই ব্যবহার করছে না?
এত সুবিধার পরও, SBC-র বাণিজ্যিক যাত্রা এখনও শুরুর পর্যায়ে। কেন? কারণ বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ এখনও কাটিয়ে ওঠা বাকি:
১. শক্তির ঘনত্ব (Energy Density)
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—SBC-র শক্তির ঘনত্ব এখনও প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির তুলনায় অনেক কম। বর্তমান SBC-তে শক্তির ঘনত্ব প্রায় ৩০-৬০ Wh/kg, যেখানে সাধারণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি দেয় ২৫০-৩০০ Wh/kg। মানে, একই ওজনে SBC কম বিদ্যুৎ ধরে রাখতে পারে। তবে গবেষকরা আশাবাদী যে আগামী ৫-১০ বছরে নতুন উপাদান ও ডিজাইনের মাধ্যমে এই ঘনত্ব বাড়ানো সম্ভব হবে।
২. দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতা
বারবার চার্জ-ডিসচার্জের ফলে কার্বন ফাইবারের কাঠামোগত শক্তি কি কমে যায়? ইলেকট্রোলাইট কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় পায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষায় বেরিয়ে আসছে। যেহেতু এটি কোনো আলাদা ব্যাটারি নয়, বরং কাঠামোর অংশ, তাই এর আয়ুষ্কাল অনেক বড় হতে হবে—যা এখনও নিশ্চিত নয়।
৩. নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো
একটা উপাদান যখন একইসঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে এবং ওজন বহন করে, তখন তার জন্য নতুন ধরণের নিরাপত্তা মানদণ্ড দরকার। দুর্ঘটনায় যদি গাড়ির বডি ভাঙে, তাহলে কি শর্ট সার্কিট হবে? আগুন লাগার ঝুঁকি কতটুকু? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে নতুন পরীক্ষা প্রোটোকল, বিল্ডিং কোড, এবং আন্তর্জাতিক মান তৈরি করা জরুরি। বর্তমান নিয়ন্ত্রক কাঠামো SBC-র মতো ‘দ্বৈত-কার্যকরী’ (Dual-Function) উপাদানের জন্য প্রস্তুত নয়।
৪. উৎপাদন জটিলতা ও খরচ
কার্বন ফাইবার ও বিশেষ পলিমার তৈরির প্রক্রিয়া এখনও অনেক ব্যয়বহুল এবং শক্তি-নিবিড়। কার্বন ফাইবার তৈরি করতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ও তাপ লাগে, তাতে কার্বন নিঃসরণও হয় অনেক। আবার এই উপাদানগুলোর পুনর্ব্যবহার (Recycling) করাও জটিল। তবে এআই-চালিত কম্পোজিট ডিজাইনের অগ্রগতি থেকে আশা করা যাচ্ছে যে ভবিষ্যতে আরও টেকসই ও জৈব-ভিত্তিক (Bio-based) বিকল্প আবির্ভূত হবে।
৫. সরবরাহ শৃঙ্খলে ভূরাজনৈতিক চাপ
মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বের ৮৫% লিথিয়াম এখন মাত্র তিনটি দেশে পরিশোধিত হয়। SBC প্রযুক্তি যদি ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি লিথিয়ামের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারে, কারণ কার্বন ফাইবারে লিথিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু তবুও নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে সময় লাগবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, SBC ভূরাজনৈতিক নির্ভরতা কমাতে পারে এবং শক্তি প্রযুক্তিতে জাতীয় স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে পারে—যদি সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা হয়।
কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার? (বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ)
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে SBC-কে স্কেলে নিয়ে যেতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মূল কর্মপন্থা’ (Key Actions) চিহ্নিত করা হয়েছে:
ক) শিল্প-নির্দিষ্ট প্রদর্শনী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা
গাড়ি, বিমান, জাহাজ নির্মাতাদের সঙ্গে যৌথভাবে কার্যকরী প্রোটোটাইপ তৈরি করতে হবে, যা মাপতে পারে—ওজন কত কমল, রেঞ্জ কত বাড়ল, কাঠামোগত অখণ্ডতা কেমন থাকল। বাস্তব প্রমাণ ছাড়া নির্মাতারা ঝুঁকি নিতে চাইবে না। তাই ছোট পরিসরে সাফল্য দেখিয়ে ধাপে ধাপে বড় আকারে যেতে হবে।
খ) বিশেষায়িত উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলা
ব্যাটারি তৈরির দক্ষতা আর অ্যাডভান্সড কম্পোজিট তৈরির দক্ষতা—দুটোকে একসঙ্গে আনার জন্য বিশেষ পাইলট উৎপাদন সুবিধা তৈরি করতে হবে। এই কারখানাগুলো SBC-র অনন্য উৎপাদন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করবে, যেমন—স্তরগুলোর সঠিক বন্ধন, ইলেকট্রোলাইটের সমান বিতরণ, এবং বৃহৎ আকারে থ্রিডি প্রিন্টিং।
এছাড়া, গবেষকরা বলছেন দরকার আন্তঃশাস্ত্রীয় সহযোগিতা—পদার্থবিজ্ঞানী, ইলেক্ট্রোকেমিস্ট, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনার, এমনকি নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আর সর্বোপরি, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা দুটোই বোঝে।
পরিবেশগত প্রভাব: সুযোগ নাকি বিপদ?
পরিবেশের দিক থেকে SBC-র দুটো দিক আছে। একদিকে, হালকা যানবাহন কম জ্বালানি খায়, কম কার্বন নিঃসরণ করে—এটা বড় সুবিধা। অন্যদিকে, কার্বন ফাইবার উৎপাদন অত্যন্ত শক্তি-নিবিড় এবং বর্তমানে এর পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা সীমিত। তবে সঠিকভাবে ডিজাইন করলে SBC উপাদানগুলোকে পুনঃব্যবহার, পুনঃপ্রয়োগ এবং পুনর্ব্যবহার করা সহজ ও সস্তা হতে পারে। ইতিমধ্যে গবেষকরা জৈব-ভিত্তিক কার্বন ফাইবার (যেমন লিগনিন বা সেলুলোজ থেকে তৈরি) নিয়ে কাজ করছেন, যা উৎপাদনে কম কার্বন নির্গত করবে এবং সহজে বায়োডিগ্রেডেবল হবে। এআই-চালিত ডিজাইনও নতুন নতুন কম পরিবেশবান্ধব বিকল্প খুঁজে বের করছে।
সামনের পথ: কী দেখতে যাচ্ছেন আগামী দশকে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী দশক SBC-র জন্য নির্ণায়ক হবে। প্রযুক্তিটি যদি স্কেলে যায়, তাহলে আমরা দেখতে পাব:
গাড়ির বডি প্যানেল যেগুলো নিজেরাই ব্যাটারি—ফলে ইভির রেঞ্জ বেড়ে যাবে ৪০-৭০%।
ড্রোন ও উড়ন্ত ট্যাক্সি যেগুলো এক চার্জে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উড়তে পারবে, কারণ তাদের ফ্রেমই শক্তি সঞ্চয় করছে।
ভবন যেগুলো শুধু আশ্রয় নয়, বরং সক্রিয় শক্তি ব্যবস্থা—দেওয়ালে সঞ্চিত বিদ্যুৎ দিয়ে চলবে লিফট, এসি, লাইট।
ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেগুলো আরও পাতলা, আরও হালকা, আরও টেকসই—কারণ ব্যাটারি আর আলাদা নেই, সেটাই কেসিং।
কিন্তু এই ভবিষ্যৎ পেতে হলে প্রযুক্তি, নীতি, বিনিয়োগ ও জনগণের আস্থা—চারটিই প্রয়োজন। সেই সব প্রতিষ্ঠান, যারা এখন থেকেই এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে, তারাই আগামী দিনের বাজারদখল করবে। কারণ SBC শুধু ‘পণ্যের উন্নতি’ নয়—এটি ‘পণ্যের ধারণা’কেই বদলে দিচ্ছে। ফর্ম আর ফাংশন—দুটোই যখন একসঙ্গে আসে, তখন ডিজাইনারদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে যায়। আর সেই দিগন্তেই হয়তো আমাদের অপেক্ষা করছে এক উজ্জ্বল, টেকসই, আর শক্তিশালী ভবিষ্যৎ।
লবণাক্ততার শক্তি: অসমোটিক পাওয়ার সিস্টেমের (Osmotic Power Systems) নতুন যুগ
পরবর্তীনিজেই দেখে, নিজেই বলে, নিজেই সতর্ক করে: স্বায়ত্তশাসিত জৈব-রাসায়নিক সেন্সর (Autonomous Biochemical Sensors)
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
আইনস্টাইনের সমস্যার পেছনের আকৃতিতে মিললো নতুন বিস্ময়কর পদার্থবিজ্ঞান

বিজ্ঞান বার্তা
১২৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো কুমিরের ফসিলে UV আলোতে মিললো সম্ভাব্য ক্যামোফ্লেজ

বিজ্ঞান বার্তা
ক্ষুদ্র কোষীয় "অ্যান্টেনা" ব্যাখ্যা করতে পারে কেন কিছু শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়
বিজ্ঞান বার্তা
'স্টমাক বাগ' প্রতিরোধী কোষকে অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে পাঠায়
বিজ্ঞান বার্তা
'সময় গতি বাড়াচ্ছিল, কমাচ্ছিল, এমনকি থেমেও যাচ্ছিল': পদার্থবিদ ল্যাবে 'মিনি-ইউনিভার্স' তৈরি করে সময়ের একটি মূল তত্ত্ব প্রমাণ করলেন
বিজ্ঞান বার্তা
নাসা ISS-এ পদার্থের পঞ্চম অবস্থা তৈরি করছে, মিনি-ফ্রিজ আকারের quantum ল্যাবের আপগ্রেডের সুবাদে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
