জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ: যে রসায়নী শক্তিশালী ইলেকট্রোলাইটের রহস্য ভেদ করেছিলেন
জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ

বিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু কিছু আবিষ্কার আসে ঝড়ের মতো, কিন্তু পরে আরেকটি তত্ত্ব এসে সেগুলোকে ছাপিয়ে যায়। তবুও সেই প্রথম ধারণাগুলোর গুরুত্ব কখনোই ম্লান হয় না—এগুলি নতুন চিন্তার বীজ বপন করে, যা পরে অন্য কেউ পূর্ণতা দেয়। জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ (জে. সি. ঘোষ) ঠিক তেমনই একজন বিজ্ঞানী। তাঁর প্রস্তাবিত শক্তিশালী ইলেকট্রোলাইট (strong electrolytes) তত্ত্বটি পরে ডেবাই-হিউকেল তত্ত্বের কাছে পিছিয়ে পড়লেও, তিনি ছিলেন সেই প্রথম মানুষ যিনি এই জটিল সমস্যার একটি গাণিতিক রূপ দিয়েছিলেন। আর তা শুধু ইলেকট্রোকেমিস্ট্রিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন গবেষণার জাল ফটোকেমিস্ট্রি, শিল্পোপনযোগী গ্যাস বিক্রিয়া এবং তড়িৎ-রসায়ন–এর বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র জুড়ে।
শিক্ষা ও গবেষণার সূচনা: কলকাতা থেকে লন্ডন
১৮৯৪ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনার রেকর্ড ছিল উজ্জ্বল। ১৯১৮ সালে তিনি ডক্টর অব সায়েন্স (D.Sc.) ডিগ্রি লাভ করেন এবং সেই বছরেই লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে অধ্যাপক ডননের সঙ্গে কাজ করার জন্য ইংল্যান্ডে যান। এই সময়েই তাঁর মেধা প্রথম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃতি পায়। লন্ডনে ফিরিয়ে আনা প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি ও তারকনাথ পালিত বৃত্তি তাঁর এই যাত্রাকে সম্ভব করেছিল। সেখানেই তিনি ফটোকেমিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং শক্তিশালী ইলেকট্রোলাইটের তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান।
শক্তিশালী ইলেকট্রোলাইটের তত্ত্ব: প্রথম গাণিতিক রূপ
১৯১৮ সালে তিনি যখন D.Sc. ডিগ্রি অর্জন করেন, ঘোষ ইতিমধ্যেই তড়িৎবিশ্লেষ্যের (electrolytes) আচরণ নিয়ে এক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। এর আগে সাদারল্যান্ড ও মিলনার আয়নের মধ্যে স্থির বৈদ্যুতিক বলের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করলেও, ঘোষই প্রথম এই ধারণাকে একটি গাণিতিক কাঠামো দেন।
তিনি প্রস্তাব করেন যে শক্তিশালী ইলেকট্রোলাইট সম্পূর্ণরূপে আয়নিত এবং আয়নগুলির মধ্যে ক্রিয়া কেবলমাত্র কুলম্বের সূত্রানুযায়ী স্থির বৈদ্যুতিক শক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তিনি সমতুল্য পরিবাহিতা (equivalent conductance) নির্ণয়ের জন্য একটি সূত্রও দাঁড় করান। তাঁর তত্ত্বটি তৎকালীন অনেক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং বালথার নের্নস্ট, ম্যাক্স প্লাংক ও স্যার উইলিয়াম ব্র্যাগ-এর মতো কিংবদন্তি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। নের্নস্ট তাঁর বিখ্যাত বই থিওরেটিশে কেমি (Theoretische Chemie)-তে ঘোষের কাজের প্রশংসা করে উল্লেখ করেছিলেন যে এই তত্ত্ব একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করেছে।
যদিও পরবর্তীতে ডেবাই ও হিউকেল ১৯২৩ সালে আরও পরিশীলিত তত্ত্ব প্রদান করেন, তারাও ঘোষের মূল চিন্তাধারাকে স্বীকার করেছেন। ডেবাই-হিউকেল তত্ত্বের 'আয়ন বায়ুমণ্ডল' ধারণাটি মূলত ঘোষের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি প্রসারিত রূপ। ২০২১ সালে রেজোন্যান্স জার্নালে প্রকাশিত একটি পুনর্মূল্যায়ন প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে ঘোষের তত্ত্ব বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আবারও গুরুত্ব পেতে শুরু করে। সুতরাং বলা যায়, তিনি ছিলেন এই ক্ষেত্রের পথিকৃৎ যাঁর কাজ পরবর্তী আবিষ্কারগুলির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: গবেষণার দুটি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা
১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানে প্রায় ১৫-২০ বছর কাজ করেন। এটিই ছিল তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময়।
ঢাকায় তিনি ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দুটি গবেষণা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন:
তাঁর পরীক্ষাগার থেকে অসংখ্য মেধাবী ছাত্র বেরিয়ে এসেছেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাক্স বোডেনস্টাইন ঘোষের এক ছাত্রের থিসিসের প্রশংসায় তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। এই সময়েই তিনি জৈব-রসায়ন ও কৃষি-রসায়নেও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।
বেঙ্গালুরু ও খড়গপুর: ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষার রূপকার
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স, বেঙ্গালুরু (১৯৩৯-১৯৪৭)
১৯৩৯ সালে তিনি সি. ভি. রমনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে এই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হন। তাঁর দূরদর্শিতায় এখানে পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেন্টেশন টেকনোলজি, উচ্চচাপ ও শিল্প গ্যাস বিক্রিয়া-র মতো নতুন বিষয় চালু হয়।
আইআইটি খড়গপুরের প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর (১৯৫০-১৯৫৪)
১৯৫০ সালে তিনি দেশের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (আইআইটি খড়গপুর) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনিই এই প্রযুক্তি-শিক্ষার মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করেন।
রাসায়নিক গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান
কৃষি ও শিল্প-উপযোগী গবেষণা
তিনি ভারতীয় কাঁচামাল থেকে ফসফেট সার, অ্যামোনিয়াম সালফেট, ফর্মালডিহাইড, পটাশিয়াম ক্লোরেট উৎপাদনের কৌশল নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন পূর্ববর্তী দেবেন্দ্রমোহন বসু: যে পদার্থবিজ্ঞানী মহাকাশ থেকে আনা কণার রহস্য ভেদ করেছিলেন নীলরতন ধর: যে রসায়নী মাটি থেকে মহাকাশে আলোর সন্ধান দিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
