গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

সংক্ষেপে: ১৭৯৬ সালে ইংরেজ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার প্রমাণ করেন যে গোয়ালাদের মধ্যে দেখা যাওয়া একটি হালকা রোগ—cowpox—মানুষকে গুটিবসন্ত থেকে রক্ষা করতে পারে। এই আবিষ্কারই আধুনিক টিকার জন্ম দেয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, জেনার আসলে যে ভাইরাসটি ব্যবহার করেছিলেন, তা সম্ভবত cowpox ছিল না—আধুনিক বিজ্ঞান বলছে এটি ছিল vaccinia বা horsepox-জাতীয় ভাইরাস। তবুও, এই টিকার সুবাদেই ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুটিবসন্তকে পৃথিবী থেকে полностью নির্মূল ঘোষণা করে—এটি ছিল মানুষের ইতিহাসে প্রথম এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র সম্পূর্ণ নির্মূল করা সংক্রামক রোগ।
একটি মহামারির ইতিহাস
গুটিবসন্ত (smallpox) মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর সংক্রামক রোগগুলোর একটি। গবেষকদের ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ বছর আগে এটি মানব জনসংখ্যায় আবির্ভূত হয়। এরপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মহাদেশের পর মহাদেশ ছড়িয়ে পড়ে, জনসংখ্যাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শুধু বিংশ শতাব্দীতেই গুটিবসন্ত প্রায় ৩০ কোটি থেকে ৫০ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছিল। আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৩ জন মারা যেত, এবং যারা বেঁচে যেত তারা অনেক সময় অন্ধ, বিকলাঙ্গ বা বিকৃত মুখাবয়ব নিয়ে বেঁচে থাকত।
জেনারের আগে: variolation-এর ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি
জেনার টিকা আবিষ্কার করার অনেক আগে থেকেই মানুষ গুটিবসন্ত প্রতিরোধের চেষ্টা করছিল। চীন, ভারত, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, যাকে বলা হতো variolation বা ইনোকুলেশন। এই পদ্ধতিতে গুটিবসন্তে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষত থেকে খোসা বা পুঁজ নিয়ে সুস্থ মানুষের ত্বকে scratched করা হতো।
লক্ষ্য ছিল আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে রোগের একটি হালকা রূপ তৈরি করা, যাতে তার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। কখনো কখনো এটি কাজ করত—রোগী হালকা উপসর্গ নিয়ে সুস্থ হয়ে যেত এবং পরে আর কখনো গুটিবসন্তে আক্রান্ত হতো না। কিন্তু এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে variolation-এর ফলে রোগী পুরোপুরি গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা যেত বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
১৭২০-এর দশকে লেডি মেরি ওয়ার্টলি মন্টাগু নামের একজন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী এই পদ্ধতি ইউরোপে নিয়ে আসেন। তিনি কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল) থাকার সময় তুর্কি পদ্ধতিটি শিখেছিলেন এবং নিজের সন্তানদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেন। এরপর ইউরোপ ও আমেরিকায় variolation একটি সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি হয়ে ওঠে। কিন্তু এর ঝুঁকি থেকে যায়—কারও কারও মতে, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১ জন variolation-এর কারণে মারা যেত।
গোয়ালাদের গল্প: folk knowledge থেকে বিজ্ঞান
এডওয়ার্ড জেনার (১৭৪৯-১৮২৩) ছিলেন ইংল্যান্ডের গ্লুচেস্টারশায়ারের বার্কলি গ্রামের একজন দেশীয় চিকিৎসক। কিন্তু তিনি শুধু একজন সাধারণ গ্রামীণ ডাক্তার ছিলেন না। তিনি লন্ডনে বিখ্যাত অস্ত্রোপচারবিদ জন হান্টারের কাছে পড়াশোনা করেছিলেন এবং রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন—তাঁর কোকিল পাখির আচরণ নিয়ে গবেষণার জন্য। জেনারের মধ্যে ছিল একজন প্রকৃতিবিদের কৌতূহল এবং একজন বিজ্ঞানীর নিষ্ঠা।
জেনারের চিকিৎসা অনুশীলন ছিল ইংল্যান্ডের একটি বড় দুগ্ধ উৎপাদন অঞ্চলে। সেখানে তিনি গোয়ালাদের (milkmaids) মুখে একটি মজার গল্প শুনতে পান: যেসব গোয়ালা গরুর ওলানে দেখা যাওয়া cowpox নামের একটি হালকা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তারা পরে কখনো গুটিবসন্তে আক্রান্ত হননি।
cowpox ছিল গরুর একটি রোগ, যা মানুষের মধ্যে ছড়ালে হালকা উপসর্গ সৃষ্টি করত—হাতে কয়েকটি ফোস্কা, সামান্য জ্বর, তারপর সুস্থ। গুটিবসন্তের মতো ভয়ংকর নয়। কিন্তু গোয়ালারা বিশ্বাস করতেন, এই হালকা রোগটি তাদের গুটিবসন্ত থেকে রক্ষা করেছে।
জেনার এই folk knowledge-কে গুরুত্বের সঙ্গে নেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে কিছু রোগীর variolation "take" করত না—অর্থাৎ, তাদের শরীরে গুটিবসন্তের টিকা কাজ করত না। এবং এই ব্যক্তিদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল: তাদের আগে cowpox হয়েছিল। তিনি এই কেসগুলি বছর ধরে রেকর্ড করেন এবং Gloucestershire-এর কম জনসংখ্যার সুবাদে রোগীদের গুটিবসন্ত ও cowpox-এর ইতিহাস ট্র্যাক করতে সক্ষম হন।
১৭৯৬ সালের সেই ঐতিহাসিক পরীক্ষা
১৭৯৬ সালের ১৪ মে, জেনার একটি সাহসী পরীক্ষা চালান। তিনি সারাহ নেলমস নামের একজন গোয়ালার হাত থেকে cowpox-এর পুঁজ নেন এবং জেমস ফিপস নামের একটি ৮ বছর বয়সী ছেলের ত্বকে scratched করেন। ছেলেটির আগে কখনো cowpox বা গুটিবসন্ত হয়নি।
জেমস cowpox-এ আক্রান্ত হন, কিন্তু হালকা উপসর্গ নিয়ে সুস্থ হয়ে যান। ছয় সপ্তাহ পরে, জেনার ছেলেটিকে সরাসরি গুটিবসন্তের উপাদানের সংস্পর্শে আনেন। ছেলেটির গুটিবসন্ত হয়নি।
জেনার এই পরীক্ষা আরও কিছু শিশুর ওপর, এমনকি নিজের ছেলের ওপরও পুনরাবৃত্তি করেন এবং একই ফলাফল পান। ১৭৯৮ সালে তিনি তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন—"An Inquiry into the Causes and Effects of the Variolae Vaccinae"—যেখানে তিনি তাঁর পদ্ধতি ও প্রমাণ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন।
জেনার এই পদ্ধতির নাম দেন "vaccination", যা ল্যাটিন শব্দ "vacca" (গরু) থেকে এসেছে। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এই পদ্ধতি একদিন গুটিবসন্তকে "annihilate" (সম্পূর্ণ ধ্বংস) করবে।
জেনারের আবিষ্কার কি সত্যিই cowpox ছিল?
এখানেই গল্পের সবচেয়ে মজার মোচড়। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে জেনার এবং পরবর্তী প্রজন্মের টিকাকাররা আসলে যে ভাইরাসটি ব্যবহার করেছিলেন, তা সম্ভবত cowpox ছিল না।
১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ গবেষক অ্যালান ডাউনি প্রথম স্পষ্টভাবে দেখান যে টিকায় ব্যবহৃত ভাইরাস—যাকে vaccinia virus বলা হয়—আর প্রাকৃতিক cowpox ভাইরাস完全不同 দুটি ভাইরাস।
জেনেটিক বিশ্লেষণ দেখিয়েছে যে vaccinia virus সম্ভবত horsepox virus-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, যা ঘোড়ার একটি রোগ। মজার ব্যাপার হলো, জেনার নিজেই বিশ্বাস করতেন যে সেরা সুরক্ষা পাওয়া যায় horse → cow → human এই চেইন অনুসরণ করলে। তিনি ঘোড়ার পায়ে দেখা যাওয়া একটি রোগ থেকে উপাদান নিয়ে গরুতে পাস করাতেন, তারপর সেই গরুর উপাদান মানুষে ব্যবহার করতেন। এই পদ্ধতিকে বলা হতো "equination"।
১৯ শতকে Beaugency lymph নামে পরিচিত একটি টিকা স্ট্রেইন ফ্রান্স থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী জেনেটিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, Beaugency lymph সম্ভবত একটি vaccinia strain বা horsepox-like virus ছিল, cowpox নয়।
আজ আমরা জানি, ২০ শতকের সব গুটিবসন্তের টিকা vaccinia virus দিয়ে তৈরি ছিল। কিন্তু এই ভাইরাসটি প্রকৃতিতে কোথাও পাওয়া যায় না—এটি শুধু টিকা উৎপাদনেরlaboratory-এ টিকে আছে। তাহলে এটি কোথা থেকে এলো? এই প্রশ্নের উত্তর আজও রহস্য।
টিকা কীভাবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল
জেনারের আবিষ্কার অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৮১৩ সালের মধ্যে ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার সব দেশে টিকা পৌঁছে যায়। কিন্তু টিকা পরিবহন ও সংরক্ষণ তখন কঠিন ছিল।
প্রাথমিকভাবে টিকা arm-to-arm পদ্ধতিতে ছড়ানো হতো—অর্থাৎ, একজন টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষত থেকে উপাদান নিয়ে পরবর্তী ব্যক্তিকে দেওয়া হতো। জাহাজে দীর্ঘ যাত্রায় টিকা সংরক্ষণের জন্যorphan children-দের ব্যবহার করা হতো—একজন থেকে আরেকজনে টিকা পাস করে জীবিত রাখা হতো।
১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে পদ্ধতি বদলাতে শুরু করে। ১৮৪২ সালে ইতালির জুসেপ্পে নেগ্রি "animal vaccine" পদ্ধতি চালু করেন, যেখানে টিকা সরাসরি গরুর শরীরে পাস করা হতো। এই পদ্ধতি বেশি টিকা উৎপাদন সম্ভব করেছিল।
বিখ্যাত Beaugency lymph ১৮৬৬ সালে ফ্রান্সে প্রাকৃতিক cowpox থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, কিন্তু জেনেটিক বিশ্লেষণ বলছে এটি আসলে vaccinia বা horsepox-জাতীয় ভাইরাস ছিল। এই lymph সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৭০ সালে, ব্রাজিলে ১৮৮৭ সালে, এবং আরও অনেক দেশে।
বিশ্বব্যাপী নির্মূল অভিযান
১৯৫৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) গুটিবসন্ত নির্মূলের জন্য একটি বৈশ্বিক কর্মসূচির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। মার্কিন চিকিৎসক ও এপিডেমিওলজিস্ট ডোনাল্ড এ. হেন্ডারসন-এর নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল: সব মানুষকে টিকা দেওয়া অসম্ভব। তাই WHO একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করে—"surveillance and containment" (নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ)। অর্থাৎ, গুটিবসন্তের প্রতিটি কেস দ্রুত শনাক্ত করে রোগীর সংস্পর্শে আসা সবাইকে টিকা দেওয়া এবং রোগীকে বিচ্ছিন্ন করা। এই কৌশল অসাধারণভাবে সফল হয়।
স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততাও এই সাফল্যের একটি মূল উপাদান ছিল।
১৯৮০ সালের ৮ মে, ৩৩তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন ঘোষণা করে যে পৃথিবী গুটিবসন্ত থেকে মুক্ত। এই রোগটি ছিল মানব ইতিহাসে প্রথম এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র সংক্রামক রোগ যা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হয়েছে।
জেনারের উত্তরাধিকার
জেনার নিজে তাঁর আবিষ্কার থেকে কোনো আর্থিক লাভের চেষ্টা করেননি। বরং টিকার প্রচারে এত সময় ব্যয় করেন যে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা অনুশীলন ও ব্যক্তিগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তাঁকে ১৮০২ সালে ১০,০০০ পাউন্ড এবং ১৮০৬ সালে আরও ২০,০০০ পাউন্ড প্রদান করে।
কিন্তু তিনি সমালোচনার মুখেও পড়েন। ১৮০২ সালে ব্যঙ্গচিত্রকর জেমস গিলরে একটি কার্টুন আঁকেন যেখানে দেখানো হয় টিকা নেওয়া মানুষদের শরীর থেকে গরুর মতো অংশ বের হচ্ছে।
তবুও, জেনারের অবদান অসামান্য। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একটি হালকা রোগ ব্যবহার করে একটি মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এটি ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি মৌলিক পরিবর্তন। তাঁর কাজ ভবিষ্যতের সব টিকার ভিত্তি তৈরি করে, যা পরবর্তীতে পোলিও, হাম, টিটেনাসসহ অসংখ্য রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়েছে।
আজ, গুটিবসন্ত নির্মূল হয়েছে, কিন্তু জেনারের উত্তরাধিকার বেঁচে আছে—প্রতিটি টিকায়, প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে, এবং প্রতিটি জীবনে যা টিকার সুবাদে রক্ষা পেয়েছে।
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা

বিজ্ঞান বার্তা
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
