HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
Prominent Vaccines
সংক্ষেপে: HPV (হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস) ভ্যাকসিন হলো পৃথিবীর প্রথম টিকা যা নির্দিষ্ট একটি ক্যান্সার—জরায়ু মুখের ক্যান্সার (cervical cancer)—প্রতিরোধের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। ২০০৬ সালে প্রথম HPV ভ্যাকসিন (Gardasil) অনুমোদিত হয়। এই ভ্যাকসিন ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়, বরং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে—যা এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। সঠিক বয়সে (৯-১২ বছর) টিকা নিলে ৭৯% পর্যন্ত জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশে টিকা কর্মসূচি চালু হয়েছে, সেখানে তরুণীদের মধ্যে জরায়ু মুখের ক্যান্সারে মৃত্যুর হার প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
HPV: ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এক নীরব ভাইরাস
HPV বা হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস একটি অত্যন্ত সাধারণ ভাইরাস, যা ত্বক ও শ্লেষ্মা ঝিল্লির সংস্পর্শে ছড়ায়। এই ভাইরাসের ২০০-এরও বেশি প্রকার রয়েছে, তবে সবগুলো ক্ষতিকর নয়। কিছু প্রকার জেনিটাল ওয়ার্ট (অণ্ডকোষ বা যৌনাঙ্গে আঁচিল) সৃষ্টি করে, আবার কিছু প্রকার ক্যান্সারের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রায় সব জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ৯৯% ক্ষেত্রেই HPV সংক্রমণ পাওয়া যায়। এছাড়াও HPV অ্যানাল ক্যান্সার, পেনাইল ক্যান্সার, ভ্যাজাইনাল ক্যান্সার, ভালভার ক্যান্সার এবং অরোফ্যারিঞ্জিয়াল (গলা ও মুখের) ক্যান্সার-এর সঙ্গেও যুক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের হার এখন জরায়ু মুখের ক্যান্সারের চেয়ে বেশি।
কিন্তু এখানেই মজার ব্যাপার: HPV সংক্রমণ খুব সাধারণ, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরীর নিজেই এটি পরিষ্কার করে ফেলে। কেবল কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে কোষের পরিবর্তন ঘটায় এবং বছরের পর বছর ধরে ক্যান্সারে পরিণত হয়। এই কারণেই প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার—কারণ সংক্রমণ হলে তা ১০-২০ বছর ধরে নীরবে ক্যান্সার তৈরি করতে পারে।
ভ্যাকসিনের জন্ম: হাইপোথিসিস থেকে বাস্তবতা
১৯৭৬: একটি সাহসী অনুমান
১৯৭৬ সালে জার্মান ভাইরোলজিস্ট হ্যারাল্ড জুর হাউজেন একটি চাঞ্চল্যকর ধারণা প্রকাশ করেন—জরায়ু মুখের ক্যান্সার সম্ভবত একটি ভাইরাসের কারণে হয়। সেই সময়ে বৈজ্ঞানিক মহলে ধারণা ছিল যে হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ ২ (HSV-2) জরায়ু মুখের ক্যান্সারের কারণ। জুর হাউজেন এই ধারণায় সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তিনি জরায়ু মুখের ক্যান্সারের টিউমার নমুনা পরীক্ষা করে দেখেন সেখানে HSV-2-এর কোনো চিহ্ন নেই। এরপর তিনি HPV-র দিকে মনোনিবেশ করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রমাণ করেন যে HPV 16 এবং HPV 18 নামের দুইটি প্রকার জরায়ু মুখের ক্যান্সারের টিউমারে উপস্থিত—এবং এই ভাইরাসগুলোই ক্যান্সারের কারণ।
এই আবিষ্কারের জন্য জুর হাউজেন ২০০৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
১৯৯১: ভাইরাস-সদৃশ কণার আবিষ্কার
কিন্তু টিকা তৈরির পথে একটি বড় বাধা ছিল: HPV-কে ল্যাবে জন্মানো যায় না। তাই প্রচলিত পদ্ধতিতে (যেমন ভাইরাস মেরে বা দুর্বল করে) টিকা তৈরি করা অসম্ভব ছিল।
১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান ফ্রেজার এবং জিয়ান ঝো একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তারা দেখেন যে HPV-র L1 প্রোটিন নিজে নিজেই ভাইরাস-সদৃশ কণা (Virus-Like Particles, VLP) তৈরি করতে পারে। এই VLP দেখতে আসল ভাইরাসের মতো, কিন্তু এতে কোনো জেনেটিক উপাদান থাকে না—তাই এটি সংক্রামক বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নয়।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা VLP-কে আসল ভাইরাস হিসেবে চিনে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই VLP-ই HPV ভ্যাকসিনের ভিত্তি।
২০০৬: প্রথম ভ্যাকসিনের অনুমোদন
VLP প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে Merck কোম্পানি Gardasil নামে প্রথম HPV ভ্যাকসিন তৈরি করে। ৭ বছরের কঠোর পরীক্ষার পর ২০০৬ সালে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) ৯-২৬ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য Gardasil 4 অনুমোদন করে। এটি HPV ৬, ১১, ১৬ এবং ১৮ প্রকার থেকে সুরক্ষা দিত।
২০০৯ সালে FDA Gardasil 4 ছেলেদের জন্যও অনুমোদন করে—কারণ HPV শুধু মেয়েদের নয়, ছেলেদেরও ক্ষতি করে (অ্যানাল ক্যান্সার, পেনাইল ক্যান্সার, জেনিটাল ওয়ার্ট)। একই বছর Cervarix নামে আরেকটি ভ্যাকসিন অনুমোদিত হয়, যা HPV ১৬ ও ১৮ থেকে সুরক্ষা দিত।
২০১৪: নয়টি প্রকারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা
২০১৪ সালে Merck Gardasil 9 নামে উন্নত সংস্করণ চালু করে। এটি ৯টি HPV প্রকার (৬, ১১, ১৬, ১৮, ৩১, ৩৩, ৪৫, ৫২, ৫৮) থেকে সুরক্ষা দেয়—যা সমস্ত HPV-সম্পর্কিত ক্যান্সারের প্রায় ৯০% কভার করে। এটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত একমাত্র HPV ভ্যাকসিন।
HPV ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে?
HPV ভ্যাকসিন একটি রিকম্বিন্যান্ট (recombinant) টিকা—এতে জীবিত ভাইরাস নেই, শুধু ভাইরাসের পৃষ্ঠের প্রোটিনের একটি নিরীহ সংস্করণ রয়েছে। টিকা ইনজেকশনের মাধ্যমে পেশিতে দেওয়া হয়।
টিকা দেওয়ার পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা VLP-কে আসল ভাইরাস হিসেবে চিনে নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডিগুলো ভবিষ্যতে প্রকৃত HPV শরীরে প্রবেশ করলে তাকে আটকে দেয়—যাতে ভাইরাস কোষে প্রবেশ করতে না পারে এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করতে না পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, HPV ভ্যাকসিন প্রতিরোধমূলক (prophylactic)—এটি ইতিমধ্যে বিদ্যমান সংক্রমণ বা ক্যান্সার নিরাময় করে না। তাই সংক্রমণের আগেই টিকা দেওয়া জরুরি।
কতটা কার্যকর? তথ্য কী বলছে?
HPV ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হয়েছে, এবং ফলাফল অসাধারণ।
জরায়ু মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ
সুইডেনে ৯,২৬,৩৬২ জন নারী ও কিশোরীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় (২০০৬-২০২৩) দেখা গেছে:
১৭ বছরের আগে টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৭৯% কম (টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায়)।
১৭ বছর বা তার পরে টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের ঝুঁকি ৩৭% কম।
ইংল্যান্ডে মৃত্যুহারে বিপ্লব
ইংল্যান্ডে স্কুল-ভিত্তিক HPV টিকা কর্মসূচির ফলাফল আরও চমকপ্রদ। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২০-২৪ বছর বয়সী টিকা নেওয়া মহিলাদের মধ্যে জরায়ু মুখের ক্যান্সারে কোনো মৃত্যুই হয়নি—যেখানে ইতিহাসের হারে ২৩টি মৃত্যু প্রত্যাশিত ছিল। এটি ১০০% মৃত্যু হ্রাস।
অন্যান্য ক্যান্সার প্রতিরোধ
২০২৬ সালের একটি বিস্তৃত পর্যালোচনায় (Vaccine Integrity Project) ১২১টি নতুন গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে:
HPV ভ্যাকসিন প্রাপ্ত ব্যক্তিদের জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৬৫% কম।
বন্ধ্যাত্ব, গর্ভাবস্থার জটিলতা, স্নায়বিক সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে কোনো বিশ্বাসযোগ্য সংযোগ পাওয়া যায়নি।
ডোজ সূচি: কে, কখন, কত ডোজ?
বয়স
রুটিন টিকাদান: ১১-১২ বছর বয়সে (৯ বছর থেকেই শুরু করা যায়)।
ক্যাচ-আপ: ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত যারা আগে টিকা নেয়নি।
২৭-৪৫ বছর: কিছু প্রাপ্তবয়স্ক চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে টিকা নিতে পারেন—তবে এই বয়সে সুবিধা কম, কারণ বেশিরভাগ মানুষ ইতিমধ্যে HPV-র সংস্পর্শে এসেছেন।
ডোজ সংখ্যা
২ ডোজ: যদি ১৫ বছরের আগে টিকা শুরু হয়—দ্বিতীয় ডোজ ৬-১২ মাস পরে।
৩ ডোজ: যদি ১৫ বছর বা তার পরে শুরু হয়—০, ১-২ মাস, ৬ মাস সূচিতে।
ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড ব্যক্তি: বয়স যাই হোক, ৩ ডোজ প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক পরিবর্তন: এক ডোজ?
২০২৬ সালের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এক ডোজ HPV ভ্যাকসিনও সম্ভবত ২-৩ ডোজের মতোই সুরক্ষা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে অনেক দেশে একক ডোজ সূচি সুপারিশ করেছে। এটি টিকা কর্মসূচিকে আরও সহজ, সস্তা ও কার্যকর করে তুলবে।
ছেলেদের জন্যও টিকা: কেন গুরুত্বপূর্ণ?
HPV শুধু মেয়েদের সমস্যা নয়। ভাইরাসটি ছেলেদের মধ্যে পেনাইল ক্যান্সার, অ্যানাল ক্যান্সার এবং অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।
তাছাড়া ছেলেরা HPV ছড়ানোর বাহকও। যদি ছেলেদ
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
পরবর্তীইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার

বিজ্ঞান বার্তা
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
