রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
সংক্ষেপে: লুই পাস্তুর শুধু গুটিবসন্তের টিকা নিয়ে কাজ করেননি—তিনি ১৮৮১ সালে অ্যানথ্রাক্স এবং ১৮৮৫ সালে রেবিজের টিকা তৈরি করে প্রমাণ করেছিলেন যে টিকা কেবল প্রাকৃতিক রোগ থেকে নয়, বরং ল্যাবে কৃত্রিমভাবে দুর্বল করা জীবাণু থেকেও তৈরি করা সম্ভব। অ্যানথ্রাক্স টিকা ছিল প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে তৈরি ব্যাকটেরিয়াল টিকা, আর রেবিজ টিকা ছিল প্রথম মানুষের টিকা যা ল্যাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এই দুই আবিষ্কার আধুনিক টিকা বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
অ্যানথ্রাক্স: প্রাণিসম্পদের ভয়ংকর শত্রু
অ্যানথ্রাক্স (anthrax) Bacillus anthracis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এটি মূলত তৃণভোজী প্রাণীদের রোগ—গরু, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া—যা মাটিতে স্পোর হিসাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ সাধারণত সংক্রামিত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে বা স্পোর শ্বাসে নিলে আক্রান্ত হয়।
১৯ শতকে অ্যানথ্রাক্স ইউরোপের প্রাণিসম্পদের জন্য এক বিশাল সমস্যা ছিল। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ প্রাণী মারা যেত। ১৮৭৬ সালে রবার্ট কখ প্রমাণ করেন যে এই রোগের কারণ একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া—এটি ছিল জীবাণু তত্ত্বের প্রথম স্পষ্ট প্রমাণগুলোর একটি।
লুই পাস্তুর ১৮৭৭ সালের দিকে অ্যানথ্রাক্স নিয়ে কাজ শুরু করেন। কিন্তু পাস্তুরের আসল যুগান্তকারী আবিষ্কার এসেছিল ১৮৭৯ সালে, যখন তিনি মুরগির কলেরা (fowl cholera) নিয়ে কাজ করছিলেন। একটি ভুলে—একটি পুরোনো ব্যাকটেরিয়া কালচার বাতাসে খোলা রেখে দেওয়ার কারণে—তিনি আবিষ্কার করেন যে ব্যাকটেরিয়া দুর্বল হয়ে গেছে এবং তা আর মুরগিকে মারতে পারছে না। আর সেই দুর্বল ব্যাকটেরিয়া মুরগিকে মারাত্মক রোগ থেকেও রক্ষা করছে। এই ঘটনাই attenuation (জীবাণু দুর্বলীকরণ) পদ্ধতির সূচনা করে।
পাস্তুরের অ্যানথ্রাক্স টিকা: ১৮৮১ সালের নাটকীয় পরীক্ষা
পাস্তুর ও তাঁর সহকর্মীরা Chamberland এবং Roux মুরগির কলেরার পদ্ধতিটি অ্যানথ্রাক্সে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু বাতাসে খোলা রাখলে অ্যানথ্রাক্স দুর্বল হয়নি। তারা খুঁজে বের করেন যে তাপ ও অক্সিজেন একসঙ্গে ব্যবহার করলে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া দুর্বল করা যায়।
১৮৮১ সালের মে মাসে পাস্তুর প্যারিসের কাছে Pouilly-le-Fort খামারে একটি নাটকীয় জনসমক্ষে পরীক্ষা চালান। পরীক্ষাটির আয়োজন করেছিলেন ভেটেরিনারিয়ান হিপ্পোলিট রোসিনোল, যিনি পাস্তুরের জীবাণু তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না। রোসিনোল নিজেই ৫৮টি ভেড়া, ২টি ছাগল, ৮টি গরু এবং ১টি ষাঁড় বাছাই করেন এবং পুরো পরীক্ষা তদারকি করেন।
পরিকল্পনা ছিল সহজ: অর্ধেক প্রাণীকে দুটি ভিন্ন মাত্রায় দুর্বল অ্যানথ্রাক্স টিকা দেওয়া হবে, অর্ধেককে কিছুই দেওয়া হবে না। এরপর সবাইকে মারাত্মক অ্যানথ্রাক্স জীবাণু দেওয়া হবে। ২ জুন পাস্তুর টেলিগ্রাম পান: যেসব প্রাণী টিকা পেয়েছিল, সবাই সুস্থ; যারা পায়নি, সবাই মারা গেছে।
এই পরীক্ষা বিশ্বব্যাপী সংবাদ হয়ে যায় এবং টিকা বিজ্ঞানের প্রতি জনসাধারণের আস্থা তৈরি করে।
একটি গোপন রহস্য
কিন্তু পাস্তুরের নোটবুক ১৯৭০-এর দশকে প্রকাশিত হওয়ার পর একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে: Pouilly-le-Fort-এ পাস্তুর আসলে জীবিত দুর্বল টিকা (live attenuated vaccine) ব্যবহার করেননি। তিনি ব্যবহার করেছিলেন রাসায়নিকভাবে নিহত টিকা (chemically killed vaccine)—যা মূলত তৈরি করেছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জিন-জোসেফ হেনরি তুসাঁ নামের একজন ভেটেরিনারিয়ান। তুসাঁ ১৮৮০ সালে অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া ৫৫°C তাপে গরম করে বা কার্বলিক অ্যাসিড দিয়ে মেরে টিকা তৈরি করেছিলেন।
অর্থাৎ, পাস্তুর জনসমক্ষে দাবি করেছিলেন যে তিনি তাঁর নিজস্ব দুর্বল টিকা ব্যবহার করছেন, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল তুসাঁর পদ্ধতিতে তৈরি নিহত টিকা। এটি ছিল বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায়।
অ্যানথ্রাক্স টিকার বিবর্তন
পাস্তুরের পর অ্যানথ্রাক্স টিকা বহু ধাপে বিবর্তিত হয়েছে:
১৮৮১: অ্যানথ্রাক্সের প্রথম টিকা—অপরিষ্কার whole-cell টিকা।
১৯৩০-এর দশক: Sterne strain নামে পরিচিত একটি জীবিত দুর্বল টিকা তৈরি হয়, যা pXO2 plasmid হারিয়েছিল। এই টিকাটিই আজও পশুদের জন্য ব্যবহৃত হয়।
১৯৭০: মানব ব্যবহারের জন্য AVA (Anthrax Vaccine Adsorbed) চালু হয়—এটি protective antigen (PA) নামক একটি প্রোটিনের ফিল্ট্রেট যা অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইডে শোষিত।
ভবিষ্যৎ: Recombinant protective antigen (rPA) ভিত্তিক টিকা—যা আরও বিশুদ্ধ, কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত এবং ঘরের তাপমাত্রায় সংরক্ষণযোগ্য।
আজ পশুদের ব্যাপক টিকাদানের ফলে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ drastically কমে গেছে। তবে ২০০১ সালে আমেরিকায় পোস্টাল অ্যানথ্রাক্স হামলার পর মানব টিকা নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়।
রেবিজ: প্রায় ১০০% মারাত্মক রোগ
রেবিজ (rabies) Lyssavirus নামক একটি ভাইরাসের কারণে হয়, যা সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর এটি প্রায় ১০০% মারাত্মক—কোনো চিকিৎসা নেই। কিন্তু লক্ষণ প্রকাশের আগে টিকা দিলে এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।
১৯ শতকে রেবিজের কোনো চিকিৎসা ছিল না। পাস্তুর এই রোগ নিয়ে কাজ শুরু করেন ১৮৮০-এর দশকের শুরুতে।
পাস্তুরের রেবিজ টিকা: ১৮৮৫ সালের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
পাস্তুরের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সাহসী। তিনি প্রথমে একটি রেবিড কুকুর থেকে স্পাইনাল কর্ডের টিস্যু নিয়ে সরাসরি খরগোশের মস্তিষ্কে প্রবেশ করাতেন (trepanation)। এভাবে খরগোশ থেকে খরগোশে ২০-২৫ বার পাস করার পর ভাইরাসটি খরগোশের জন্য ধারাবাহিকভাবে মারাত্মক হয়ে ওঠে।
এরপর তিনি খরগোশের স্পাইনাল কর্ডের টুকরো নিয়ে শুকনো বাতাসে রাখতেন। বাতাসের সংস্পর্শে ভাইরাসের virulence (রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা) ধীরে ধীরে কমে যেত। ১৫ দিন শুকনো রাখলে ভাইরাস সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে যেত।
পাস্তুর এই পদ্ধতি প্রায় ৫০টি কুকুরে পরীক্ষা করে দেখেন যে তারা রেবিজ থেকে সুরক্ষিত হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের ওপর এটি কখনো পরীক্ষা করা হয়নি।
জোসেফ মাইস্টার: ৯ বছরের বালক
১৮৮৫ সালের ৪ জুলাই, আলসাস থেকে ৯ বছরের জোসেফ মাইস্টার নামের একটি বালককে প্যারিসে আনা হয়। তাকে একটি রেবিড কুকুর ১৪ বার কামড়েছিল। তখন রেবিজ মানেই মৃত্যু—কোনো আশা নেই।
জোসেফের মা পাস্তুরের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করেন। পাস্তুরের সহকর্মীরা—বিশেষ করে এমিল রু—মানুষের ওপর পরীক্ষা করতে রাজি ছিলেন না, কারণ এটি শুধু কুকুরে সফল হয়েছিল। কিন্তু ডাক্তার জাক জোসেফ গ্রাঞ্চে পাস্তুরকে রাজি করান এবং নিজে টিকা দেওয়ার দায়িত্ব নেন।
৬ জুলাই সন্ধ্যায়, পাস্তুর ১৫ দিন শুকনো রাখা (অর্থাৎ, সবচেয়ে দুর্বল) খরগোশের স্পাইনাল কর্ডের উপাদান দিয়ে জোসেফকে প্রথম ইনজেকশন দেন। পরের ১০ দিন ধরে, ধীরে ধীরে কম শুকনো (অর্থাৎ, বেশি virulent) উপাদান দিয়ে মোট ১২টি ডোজ দেওয়া হয়।
শেষ ডোজে জোসেফকে প্রায় সম্পূর্ণ virulent রেবিজ ভাইরাস দেওয়া হয়—কিন্তু সে অসুস্থ হয়নি! জোসেফ মাইস্টার বেঁচে যায়।
এই সাফল্য বিশ্বব্যাপী সংবাদ হয়ে যায়। রেবিজে আক্রান্ত রোগীরা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্যারিসে আসতে শুরু করেন। ১৮৮৮ সালে পাস্তুর ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।
রেবিজ টিকার বিবর্তন
পাস্তুরের মূল টিকায় সমস্যা ছিল: এটি খরগোশের স্পাইনাল কর্ড থেকে তৈরি, যাতে myelin নামক পদার্থ থাকে যা neuroparalytic encephalomyelitis নামক মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
১৯০৮: Fermi vaccine—ভেড়া/ছাগলের মস্তিষ্ক থেকে, ফেনল দিয়ে নিহত।
১৯১১: Semple vaccine—ভেড়া/ছাগলের মস্তিষ্ক থেকে, ফেনল দিয়ে সম্পূর্ণ নিহত। নিরাপদ কিন্তু myelin-জনিত ঝুঁকি ছিল।
১৯৫৫-৬৪: Suckling mouse brain vaccine—নবজাতক ইঁদুরের মস্তিষ্ক থেকে, যাতে myelin কম থাকে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমে।
১৯৫৬: Duck embryo vaccine—হাঁসের ভ্রূণ থেকে। নিরাপদ কিন্তু immunogenicity দুর্বল।
১৯৬০-এর দশক: Cell culture vaccines—এই যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। Human diploid cell vaccine (HDCV) মানব কোষে রেবিজ ভাইরাস বাড়িয়ে তৈরি হয়। এটি অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর।
১৯৮০-এর দশক: Purified chick embryo cell vaccine (PCECV) এবং Purified Vero cell vaccine (PVCV)—আরও সস্তা ও সহজে উৎপাদনযোগ্য।
আজ রেবিজ টিকা post-exposure prophylaxis (PEP) হিসেবে দেওয়া হয়—কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব। আধুনিক টিকা অত্যন্ত নিরাপদ এবং প্রায় ১০০% কার্যকর যদি সময়মতো দেওয়া হয়।
পাস্তুরের উত্তরাধিকার
পাস্তুর ১৮৮১ সালে অ্যানথ্রাক্স এবং ১৮৮৫ সালে রেবিজ টিকার মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে:
১. রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে ল্যাবে দুর্বল করে টিকা তৈরি করা সম্ভব—এটি ছিল germ theory-এর একটি বিশাল বিজয়।
২. একটি রোগের টিকা সেই রোগের বিরুদ্ধেই কাজ করে—এটি আজ স্বাভাবিক মনে হলেও তখন নতুন ছিল।
৩. বিজ্ঞান জনসাধারণের সামনে খোলা রাখা উচিত—Pouilly-le-Fort-এর জনসমক্ষে পরীক্ষা বিজ্ঞান যোগাযোগের একটি মডেল হয়ে আছে।
আজ অ্যানথ্রাক্স পশুদের মধ্যে বিরল, এবং রেবিজ টিকা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচায়। পাস্তুরের এই দুই আবিষ্কার আধুনিক টিকা বিজ্ঞানের ভিত্তি—যা আজ COVID-19 থেকে শুরু করে ক্যান্সারের টিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
পরবর্তীইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা

বিজ্ঞান বার্তা
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
