জগদীশচন্দ্র বসু: যে বিজ্ঞানী বেতার তরঙ্গের পর উদ্ভিদেরও ‘ভাষা’ খুঁজেছিলেন
জগদীশচন্দ্র বসু

একটি গাছের দিকে তাকালে আমরা সাধারণত কী দেখি?
সবুজ পাতা, ডালপালা, ফুল কিংবা ফল। গাছকে জীবিত প্রাণী হিসেবে জানলেও তার অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। গাছ কি আঘাত পেলে কোনোভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়? আলো, তাপ বা অন্য কোনো উদ্দীপনায় তার শরীরে কি পরিবর্তন ঘটে?
আজ উদ্ভিদবিজ্ঞান ও উদ্ভিদ-শারীরবিদ্যার গবেষণায় এসব প্রশ্ন নিয়ে কাজ করা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে এমন প্রশ্ন করা ছিল অনেকটাই অচেনা পথের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এই পথেই এগিয়েছিলেন একজন বাঙালি বিজ্ঞানী—আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু।
তবে উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণাই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। তারও আগে তিনি এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন, যার সঙ্গে আজকের বেতার যোগাযোগ, মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি এবং আধুনিক রেডিওবিজ্ঞানের ইতিহাসের যোগসূত্র রয়েছে।
একজন মানুষ কীভাবে পদার্থবিজ্ঞান থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞান, আর বেতার তরঙ্গ থেকে জীবন্ত উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া—এত দূরের দুটি জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করলেন?
সেই গল্প শুরু হয় ময়মনসিংহ থেকে।
ময়মনসিংহের সেই ছোট্ট ছেলেটি
১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন জগদীশচন্দ্র বসু। তখন এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ; আজকের বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর জন্মস্থান যুক্ত। তাঁর বাবা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং শিক্ষার প্রতি গভীরভাবে আগ্রহী মানুষ।
শৈশবে জগদীশচন্দ্রের শিক্ষা শুরু হয় বাংলা মাধ্যমে। তাঁর বাবা মনে করতেন, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েই শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়া উচিত। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে জগদীশচন্দ্রের চিন্তাভাবনায়ও প্রভাব ফেলেছিল।
শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পড়াশোনা নয়—প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখা, চারপাশের জগতকে বোঝা এবং প্রশ্ন করার অভ্যাস তাঁর মধ্যে ছোটবেলাতেই তৈরি হয়।
পরে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় যান।
কলকাতা থেকে ইংল্যান্ড
জগদীশচন্দ্র কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ফাদার ইউজিন লাফোঁর প্রভাব তাঁর বিজ্ঞানচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং কেমব্রিজের Christ's College-এ Natural Sciences নিয়ে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি তিনি University of London থেকে B.Sc. ডিগ্রিও অর্জন করেন।
ইংল্যান্ডে থাকার সময় তিনি ইউরোপীয় বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতির সঙ্গে পরিচিত হন।
পদার্থবিজ্ঞান তখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, আলো এবং তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ নিয়ে বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন পরীক্ষা করছেন। জগদীশচন্দ্রও এই জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন।
তবে তাঁর সামনে তখনও একটি বড় বাধা ছিল।
তিনি ফিরে যাবেন ভারতে।
দেশে ফিরে এক অসম লড়াই
শিক্ষা শেষ করে জগদীশচন্দ্র ভারতে ফিরে আসেন এবং কলকাতার Presidency College-এ পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
কিন্তু একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।
ঔপনিবেশিক ভারতে ইউরোপীয় ও ভারতীয় শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য ছিল। জগদীশচন্দ্রও বেতন, গবেষণার অর্থ এবং পরীক্ষাগারের সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হন। তবুও তিনি গবেষণা থামিয়ে দেননি।
বরং সীমিত সুযোগের মধ্যেই তিনি নিজের পরীক্ষার যন্ত্রপাতি তৈরি করতে শুরু করেন।
পরবর্তীকালে তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে এটি—
যে যন্ত্র দরকার, সেটি না থাকলে নিজেই বানিয়ে নেওয়া।
চোখের সামনে অদৃশ্য তরঙ্গ
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন: যে মানুষটি বাংলায় বিজ্ঞানকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু: যে বাঙালি বিজ্ঞানীর নামে কণার নাম হলো ‘বোসন’ পূর্ববর্তী
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
