বিজ্ঞানের চর্চা কি শুধুই গবেষণাগারের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ? নাকি এর আরও বিস্তৃত পরিসর রয়েছে? অধ্যাপক ড. আলী আসগর-এর জীবন এই প্রশ্নের জবাব দেয়। যিনি ছিলেন একাধারে পদার্থবিজ্ঞানী, গবেষক, উদ্ভাবনী বিজ্ঞান শিক্ষার রূপকার, জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক এবং শিশু-কিশোরদের বিজ্ঞানমনা করে তোলার এক অসামান্য সংগঠক ।
তিনি বাংলাদেশের বিজ্ঞান জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ও গবেষণার অবকাঠামো গঠনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আসগর ১৯৩৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে জন্মগ্রহণ করেন ।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন । এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং ১৯৭০ সালে কঠিন অবস্থা পদার্থবিজ্ঞানে (Solid State Physics) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন । পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে কমনওয়েলথ স্টাফ ফেলোশিপ নিয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করেন । এছাড়াও তিনি ইতালির ICTP ও সুইডেনের আপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের IPPS-এ গবেষণা ফেলো হিসেবেও কাজ করেছেন ।
গবেষণা ও পেশাগত জীবন
বুয়েটে কর্মজীবন
১৯৬২ সালে অধ্যাপক আসগর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন । তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন এবং সিন্ডিকেট সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন । তিনি বুয়েটের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ "প্রফেসর রশিদ চেয়ার"-ও অধিষ্ঠিত ছিলেন । পরবর্তীতে তিনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ফিজিক্স ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ।
চৌম্বক পদার্থের গবেষণা
অধ্যাপক আসগরের গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল চুম্বকত্ব (Magnetism) ও চৌম্বক পদার্থ (Magnetic Materials) ।
তিনি বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একটি আধুনিক চুম্বকত্ব গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন । সুইডেনের আপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় তিনি "ঢাকা মেটেরিয়াল সায়েন্স গ্রুপ" গঠন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল চৌম্বকীয় সংকর ধাতু, ফেরাইট, চৌম্বকীয় পাতলা ফিল্ম, নিরাকার চৌম্বক পদার্থ ও ন্যানো-কাঠামোবদ্ধ পদার্থ প্রস্তুত করার সক্ষমতা তৈরি করা । পরমাণু শক্তি কমিশনের (AEC) সঙ্গে যৌথভাবে তিনি বিভিন্ন চৌম্বক পদার্থের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যা প্রযুক্তিগত কাজে ব্যবহারের উপযোগী হার্ড, সেমি-হার্ড ও সফট ম্যাগনেটিক মেটেরিয়াল তৈরি করতে সহায়ক হয় । এই গবেষণায় তিনি ৩০টিরও বেশি পিএইচডি ও এমফিল থিসিস তত্ত্বাবধান করেছেন ।
প্রকাশনা ও স্বীকৃতি
তিনি রয়্যাল সোসাইটি, ফিজিক্যাল রিভিউ, ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স-সহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে ৮০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন ।
গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ডক্টর মুনীরুজ্জামান স্বর্ণপদক, ডক্টর কুদরত-এ-খুদা স্বর্ণপদক, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন স্বর্ণপদক এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক স্বর্ণপদক লাভ করেন ।
বিজ্ঞান শিক্ষা ও জনপ্রিয়করণে অবদান
শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি অধ্যাপক আসগরের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বিজ্ঞানকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থায় উদ্ভাবনী চিন্তার প্রসার ঘটানো।
মুখস্থ বিদ্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার
তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র সমালোচক ছিলেন। তাঁর মতে, শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই মুখস্থ সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রশ্নহীন হয়ে যাচ্ছে । তিনি বলতেন, বিজ্ঞান মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছে, স্বাধীনচেতা করেছে, তাই শিক্ষার্থীদের প্রশ্নপ্রবণ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ।
দেশব্যাপী সায়েন্স ক্লাব আন্দোলন
তিনি শিশু-কিশোর সংগঠন "খেলাঘর"-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দেশব্যাপী বিজ্ঞান ক্লাব আন্দোলনের সূচনা করেন । এই ক্লাবগুলোর মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ তৈরি করেন। বিজ্ঞান মেলার প্রকল্প মূল্যায়ন ও সংগঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী ।
বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড
তিনি বাংলাদেশ সায়েন্স অলিম্পিয়াড কমিটির অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন । তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব শেখার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ।
বিজ্ঞান লেখক ও প্রচারক
বিজ্ঞান চর্চার প্রসারে অধ্যাপক আসগর অসংখ্য বই ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি ২৬টিরও বেশি বই লিখেছেন এবং পাঁচশতাধিক জনপ্রিয় বিজ্ঞান নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন । বিজ্ঞান বিষয়ক তাঁর বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—'সময় প্রসঙ্গে', 'ভাষা ও বিজ্ঞান', 'বিজ্ঞান প্রতিদিন', 'বিজ্ঞানের বিচিত্র জগত থেকে', 'বিজ্ঞানের মজার প্রজেক্ট' প্রভৃতি । তিনি বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিজিক্স-এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন এবং শতাধিক টেলিভিশন ও রেডিও অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলেছেন ।
জাতীয় বিজ্ঞান সপ্তাহের প্রস্তাবক
তিনি জাতীয় বিজ্ঞান সপ্তাহ (National Science Week) কর্মসূচি নকশা ও প্রস্তাব করেছিলেন, যা উদ্ভাবনী বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য একটি মাইলফলক ।
সম্মাননা ও শেষ জীবন
অধ্যাপক আলী আসগর ২০০৪ সালে বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের ফেলো (Fellow) নির্বাচিত হন । তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো এবং বাংলাদেশ ফিজিক্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন ।
তিনি ১৯৯৭ সালের জাতীয় শিক্ষা কমিটির সদস্য ও বিজ্ঞান শিক্ষা উপ-কমিটির আহ্বায়ক, এবং বাংলাদেশের প্রযুক্তি নীতি পর্যালোচনার আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ।
২০২০ সালের ১৬ জুলাই তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে ৮১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক চিন্তার জগৎ এক অগ্রদূতকে হারায়।
শেষকথা
অধ্যাপক ড. আলী আসগর ছিলেন একাধারে একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী, নিষ্ঠাবান শিক্ষক এবং বিজ্ঞান আন্দোলনের রূপকার। গবেষণার মাধ্যমে যেমন তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোর গভীরে গিয়েছেন, তেমনি জনপ্রিয় বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে সেই জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি কেবলমাত্র বুয়েটের একটি গবেষণাগারকে চৌম্বক পদার্থ গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করেননি; তিনি সারা দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞানচর্চার বীজ বপন করেছেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার যে ভিত্তিমূল্য আজ দৃশ্যমান, তার অন্যতম স্থপতি এই মহান বিজ্ঞানী।