পারমাণবিক শক্তির নতুন যুগ: অ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার টেকনোলজি (Advanced Nuclear Technologies)
Advanced Nuclear Technologies

কল্পনা করুন একটি শহর, যেখানে বিদ্যুৎ আসছে একটি ছোট্ট বাক্সের মতো দেখতে রিঅ্যাক্টর থেকে—যা তৈরি হয়েছে কারখানায়, ট্রাকে করে আনা হয়েছে, আর বসানো হয়েছে কোনো শিল্প কারখানার পাশে। এটি আর কোনও বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নয়; বরং অ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার টেকনোলজি বা উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তির বাস্তব রূপ। যখন সারা বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় কার্বন-মুক্ত শক্তির দিকে ছুটছে, তখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে আকাশচুম্বী—বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার, আর শিল্প কারখানাগুলো নতুন নতুন শক্তি চাইছে। এই চাহিদা মেটাতে পুরোনো পদ্ধতির পারমাণবিক চুল্লির পাশাপাশি আসছে এক নতুন বিপ্লব। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (World Economic Forum) তাদের '২০২৫ সালের শীর্ষ ১০ উদীয়মান প্রযুক্তি'-র তালিকায় স্থান দিয়েছে এই অ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার টেকনোলজিকে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক এই প্রযুক্তি কী, কেন এত আলোচনা, এবং কীভাবে এটি আমাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে—পুরোপুরি সহজ, রোয়ারবাংলা স্টাইলে।
প্রথমে একটু পটভূমি: কেন পারমাণবিক শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে?
আমরা জানি, পৃথিবী এখন জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে গিয়ে একদিকে যেমন সৌর ও বায়ুশক্তি জনপ্রিয় হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের সমস্যা হলো—এরা অনিয়মিত। রোদ না থাকলে বা বাতাস না বইলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। আর এখন তো বিদ্যুৎ চাহিদা এমনিতেই লাফিয়ে বাড়ছে। ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন, ডেটা সেন্টারের হাজার হাজার সার্ভার, আর শিল্প কারখানায় উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন—এসব মেটাতে দরকার একটি স্থিতিশীল, নির্ভরযোগ্য ও কার্বন-মুক্ত শক্তির উৎস। আর এখানেই উঠে আসে পারমাণবিক শক্তি। কিন্তু পুরোনো ধাঁচের বড় বড় নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করতে সময় লাগে ১০-১৫ বছর, খরচ হয় হাজার হাজার কোটি টাকা, আর নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মনে ভয় কাজ করে। এই সমস্যাগুলোর সমাধানেই এগিয়ে আসছে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তি।
জেনারেশন III থেকে জেনারেশন IV: বিবর্তনের গল্প
পারমাণবিক চুল্লির বিবর্তনকে আমরা ধাপে ধাপে ভাবতে পারি। জেনারেশন III রিঅ্যাক্টরগুলো হচ্ছে বর্তমান সময়ের আধুনিক চুল্লি, যেগুলো প্রধানত চাপযুক্ত পানি-শীতল (Pressurized Water-Cooled) পদ্ধতিতে চলে। এগুলোতে দুর্ঘটনা-সহনশীল জ্বালানি (Accident-Tolerant Fuels) এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। যেমন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে দুটি AP1000 এবং ইউরোপে দুটি EPR (European Pressurised Reactor) চালু হয়েছে—এগুলোই জেনারেশন III-এর উদাহরণ।
কিন্তু এরপর আসে জেনারেশন IV—যেখানে পুরোনো পানি-শীতল পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে বিকল্প শীতলকারী (Coolant) হিসেবে গলিত ধাতু (Molten Metals), গলিত লবণ (Molten Salts), বা হিলিয়ামের মতো গ্যাস ব্যবহারের কথা। এই বিকল্প শীতলকারী পদার্থগুলো অনেক বেশি তাপমাত্রায় (৬০০-৯৫০°C পর্যন্ত) এবং কম চাপে কাজ করতে পারে। ফলে চুল্লির নকশা হয় সরল, নিরাপত্তা বাড়ে, খরচ কমে, আর দক্ষতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টর (Gas-Cooled Reactors) এখন খুব আলোচিত, কারণ এরা শুধু বিদ্যুৎই নয়, উচ্চ-তাপমাত্রার প্রক্রিয়াজাত তাপ (High-Temperature Process Heat) সরবরাহ করতে পারে, যা হাইড্রোজেন উৎপাদন বা ইস্পাত শিল্পের মতো কঠিন-থেকে-শোধনযোগ্য ক্ষেত্রগুলোতে কাজে লাগবে।
ছোট কিন্তু শক্তিশালী: স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (SMR)
এবার আসি সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশে—স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর বা সংক্ষেপে SMR। নাম থেকেই বোঝা যায়, এগুলো ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লি। একটি SMR-এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সাধারণত প্রচলিত বড় রিঅ্যাক্টরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু এর বিশেষত্ব হলো, এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশগুলি কারখানায় তৈরি করে ট্রাকে বা জাহাজে করে সরাসরি স্থাপনের জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। তার মানে, সাইটে গিয়ে প্রকাণ্ড নির্মাণকাজের দরকার নেই। আর যেহেতু একই ডিজাইনের একাধিক SMR একসঙ্গে বসিয়ে মোট উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো যায়, তাই প্রতিবার নতুন ডিজাইন করতে হয় না—যা খরচ ও সময় দুটোই বাঁচায়।
ধরুন, কোনো প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা বা দ্বীপে বিদ্যুৎ পৌঁছানো কঠিন। সেখানে একটি SMR প্ল্যান্ট বসিয়ে দেওয়া সম্ভব। আবার কোনো বড় শিল্প কারখানার পাশে বসিয়ে তাদের প্রক্রিয়াজাত তাপ ও বিদ্যুৎ—দুটোই দেওয়া সম্ভব। এই নমনীয়তার কারণে SMR-কে বিতরণযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন (Distributed Power Generation)-এর জন্য আদর্শ মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে SMR নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে রাশিয়া ও চীন—তারা ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে SMR চালু করেছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা—তাদের ডিজাইন, নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো (Regulatory Frameworks) দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ও অ্যাকসেন্টার যৌথভাবে SMR স্থাপন ত্বরান্বিত করার জন্য একটি সহযোগিতামূলক কাঠামো প্রকাশ করেছে, যাতে বিভিন্ন অংশীদাররা (সরকার, বিনিয়োগকারী, জনগণ) একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
বড় খেলোয়াড়রা কারা? বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগের চিত্র
পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এখন বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার বিষয়। রাশিয়া ও চীন ছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশ বড় বড় প্রকল্পে হাত দিয়েছে:
দক্ষিণ কোরিয়া—তাদের ২৬টি পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে, যা দেশের মোট বিদ্যুতের এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। তারা নতুন প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)—তাদের ক্লিন এনার্জি স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ১৬৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তারা তাদের মোট বিদ্যুতের অর্ধেক পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নতুন জেনারেশন III রিঅ্যাক্টর চালু করেছে। এছাড়া SMR-এর জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা হচ্ছে এবং নতুন জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র (Fuel Fabrication Facilities) ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট (Enrichment Plants) তৈরির কাজ চলছে, যাতে এই দশকের শেষ নাগাদ SMR স্থাপন সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে SMR বিদ্যুৎ সরবরাহের পদ্ধতিটাই বদলে দিতে পারে। আর ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের পারমাণবিক ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে, যা নেট-জিরো নির্গমন লক্ষ্য পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।
আরও দূরের স্বপ্ন: নিউক্লিয়ার ফিউশন
যদিও এখনকার বাস্তবতা হলো ফিশন (পরমাণু বিভাজন) প্রযুক্তি, কিন্তু বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন হলো নিউক্লিয়ার ফিউশন—যে প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন পরমাণু মিলে হিলিয়াম তৈরি করে এবং প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়, ঠিক যেমনটা সূর্যের ভেতরে ঘটে। ফিউশনে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য অনেক কম, জ্বালানি প্রায় অফুরন্ত (সমুদ্রের পানি থেকে হাইড্রোজেন সংগ্রহ করা যায়), আর কার্বন নিঃসরণ একদম শূন্য। যদিও এখনও পর্যন্ত ফিউশনে নেট পাওয়ার গেইন (উৎপাদিত শক্তি > খরচ হওয়া শক্তি) অর্জিত হয়নি, তবে গবেষকরা আত্মবিশ্বাসী যে আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে এই প্রযুক্তি পরিণত হবে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, চীন—সবাই ফিউশন নিয়ে মেগা-প্রকল্পে কাজ করছে। এটা যদি সফল হয়, তবে পৃথিবীর শক্তি সমস্যার প্রায় স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে।
চ্যালেঞ্জ: এগোতে গিয়ে কী কী বাধা আছে?
অ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার টেকনোলজি নিয়ে এত আশাবাদ থাকলেও, বাস্তবে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আছে যা কাটিয়ে উঠতে হবে:
১. উচ্চ প্রাথমিক খরচ (High Initial Capital Cost)—SMR ছোট আকারের হলেও, প্রথম প্ল্যান্টটির ডিজাইন ও লাইসেন্সিং খরচ অনেক বেশি। তবে একাধিক SMR উৎপাদন শুরু হলে খরচ কমে যাবে, কারণ স্কেল অফ ইকোনমি কাজ করবে।
২. সাপ্লাই চেইন ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব—বিশেষ ধরনের তেজস্ক্রিয়-প্রতিরোধী ধাতু, জ্বালানি, এবং যন্ত্রাংশের স্থিতিশীল সরবরাহ এখনও নিশ্চিত নয়। আরও দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ২৫% কমে গিয়েছে। অর্থাৎ, নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলী তৈরি করতে না পারলে এই শিল্প এগোবে কীভাবে?
৩. জনগণের আস্থা ও নিরাপত্তা উদ্বেগ—চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনও মানুষের মনে গভীর। তাই নতুন প্রযুক্তি যতই নিরাপদ হোক না কেন, স্বচ্ছ যোগাযোগ, কমিউনিটি-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা প্রদর্শন, এবং শিক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরে পেতে হবে। ফোরামের প্রতিবেদনে 'কমিউনিটি-ফোকাসড সেফটি ডেমোনস্ট্রেশন'-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
৪. সাইবার নিরাপত্তা—যেহেতু নতুন প্ল্যান্টগুলো ডিজিটালাইজড ও স্বয়ংক্রিয়, তাই সাইবার হামলার ঝুঁকিও বেড়েছে। নিরাপদ, স্থিতিস্থাপক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শক্ত সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৫. নিয়ন্ত্রক ও লাইসেন্সিং জটিলতা—SMR-এর জন্য আলাদা, আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো দরকার, যা এখনও অনেক দেশে তৈরি হয়নি। নিয়মকানুনে বিলম্ব হলে প্রকল্প পিছিয়ে যায়।
ভবিষ্যৎ: কোথায় যাচ্ছে এই প্রযুক্তি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার টেকনোলজি একক কোনও মডেলে এগোবে না; বরঞ্চ ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহারের জন্য আলাদা পথ ধরবে:
SMR প্রথমে প্রত্যন্ত সম্প্রদায় (যেমন দ্বীপ, পাহাড়ি এলাকা) এবং শিল্প কারখানা (যারা গ্রিড-স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ চায়) সেখানে জনপ্রিয় হবে।
বড় শহরগুলোর পুরোনো কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জায়গায় বসানো যাবে আধুনিক পারমাণবিক চুল্লি, যা বিদ্যমান ট্রান্সমিশন লাইন ব্যবহার করে দ্রুত বিদ্যুৎ দিতে পারবে।
সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো শিল্প ডিকার্বনাইজেশন—ইস্পাত, সিমেন্ট, রাসায়নিক শিল্পে উচ্চ-তাপমাত্রার প্রয়োজন, যা গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব। এই শিল্পগুলো বিশ্বের ১৫% কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী, তাই এখানে পারমাণবিক তাপ ব্যবহার করলে বিরাট পরিবর্তন আসবে।
আরও একটি সম্ভাবনা হলো—পারমাণবিক বিদ্যুৎ দিয়ে হাইড্রোজেন উৎপাদন। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিয়ে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করা যায়, যা পরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ, নিউক্লিয়ার আর রিনিউয়েবলের সমন্বয়ে তৈরি হবে একটি সম্পূর্ণ শক্তি বাস্তুতন্ত্র, যেখানে প্রতিটি উৎস অন্যটির ফাঁকা জায়গা পূরণ করবে।
জনমত ও নীতিনির্ধারণ: জনগণকে কীভাবে বুঝতে হবে?
পারমাণবিক প্রযুক্তি সফল করতে হলে শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং যথেষ্ট নয়; দরকার জনমত গঠন ও নীতি-সহায়তা। অনেকেই ভয় পায় তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের কথা। কিন্তু নতুন জ্বালানি ও রিঅ্যাক্টর ডিজাইনে বর্জ্যের পরিমাণ অনেক কম এবং তা অনেক কম সময়ের জন্য তেজস্ক্রিয় থাকে। আবার অনেক নতুন ডিজাইন এমন যে এরা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা ঘটতেই দেয় না—মাধ্যাকর্ষণ বা প্রাকৃতিক সঞ্চালনের মাধ্যমেই ঠান্ডা হয়ে যায়।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ 'মূল কর্মপন্থা' (Key Actions) উল্লেখ করা হয়েছে:
প্রোটোটাইপ পরীক্ষা ত্বরান্বিত করা—বিশেষ করে গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টরগুলির নিরাপত্তা ও দক্ষতা নানা পরিস্থিতিতে যাচাই করতে বড় বড় পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে অর্থ বিনিয়োগ করা।
সম্প্রদায়-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা প্রদর্শন—স্থানীয় মানুষকে প্ল্যান্টে নিয়ে গিয়ে দেখানো, খোলামেলা আলোচনা করা, কীভাবে এই চুল্লি নিরাপদ, কীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয়—এসবের মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: কী হতে পারে?
বাংলাদেশে এখনও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে রূপপুরে, যা রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি হচ্ছে—এটা মূলত জেনারেশন III ধাঁচের। কিন্তু অ্যাডভান্সড টেকনোলজি, যেমন SMR বা গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টর, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও কিন্তু বড় সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। কারণ:
SMR-এর ছোট আকার ও কারখানায় নির্মাণের সুবিধা থাকায় তুলনামূলকভাবে কম পুঁজি ও সময়ে নতুন প্ল্যান্ট স্থাপন করা যেতে পারে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা উপকূলীয় এলাকায়, যেখানে বড় প্ল্যান্ট তৈরি করা কঠিন, সেখানে SMR বসানো যেতে পারে।
শিল্প কারখানায় উচ্চ-তাপমাত্রার প্রয়োজন মেটাতে গ্যাস-শীতল রিঅ্যাক্টর ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে।
যদিও বাংলাদেশের এখনও নিজস্ব SMR তৈরির সক্ষমতা নেই, তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে, প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী তৈরি করে, এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রস্তুত রেখে এই প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হওয়া জরুরি। কারণ, বিশ্ব যখন দ্রুত এগোচ্ছে, আমাদেরও পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
শেষ কথা: এক নতুন শক্তি বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে
অ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার টেকনোলজি শুধু আরেকটি প্রযুক্তিগত উন্নতি নয়—এটি হলো জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর থেকে শুরু করে ফিউশনের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন শক্তি বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। প্রযুক্তি যেমন এগোচ্ছে, তেমনি দরকার জনগণের সচেতনতা, সরকারের সঠিক নীতি, এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সামনের দশকগুলোতে আমরা হয়তো দেখব, পারমাণবিক শক্তি আর ভয়ের বিষয় নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ—যে বিদ্যুৎ আসবে না কোনো প্রকাণ্ড কারখানা থেকে, বরং আমাদের শহরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি নিরাপদ, ছোট্ট চুল্লি থেকে। সেই ভবিষ্যৎ কি সত্যিই এত দূরে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, না—এটা ঠিক আমাদেরই হাতের নাগালে, যদি আমরা আজ থেকেই প্রস্তুতি শুরু করি।
লবণাক্ততার শক্তি: অসমোটিক পাওয়ার সিস্টেমের (Osmotic Power Systems) নতুন যুগ
পরবর্তীনিজেই দেখে, নিজেই বলে, নিজেই সতর্ক করে: স্বায়ত্তশাসিত জৈব-রাসায়নিক সেন্সর (Autonomous Biochemical Sensors)
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
আইনস্টাইনের সমস্যার পেছনের আকৃতিতে মিললো নতুন বিস্ময়কর পদার্থবিজ্ঞান

বিজ্ঞান বার্তা
১২৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো কুমিরের ফসিলে UV আলোতে মিললো সম্ভাব্য ক্যামোফ্লেজ

বিজ্ঞান বার্তা
ক্ষুদ্র কোষীয় "অ্যান্টেনা" ব্যাখ্যা করতে পারে কেন কিছু শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়
বিজ্ঞান বার্তা
'স্টমাক বাগ' প্রতিরোধী কোষকে অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে পাঠায়
বিজ্ঞান বার্তা
'সময় গতি বাড়াচ্ছিল, কমাচ্ছিল, এমনকি থেমেও যাচ্ছিল': পদার্থবিদ ল্যাবে 'মিনি-ইউনিভার্স' তৈরি করে সময়ের একটি মূল তত্ত্ব প্রমাণ করলেন
বিজ্ঞান বার্তা
নাসা ISS-এ পদার্থের পঞ্চম অবস্থা তৈরি করছে, মিনি-ফ্রিজ আকারের quantum ল্যাবের আপগ্রেডের সুবাদে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
