সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিগন্তবিস্তারক
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এমন কিছু নাম আছে যাঁরা শুধু লিখেই যাননি, বরং সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রতিভা। যাঁকে বলা হয় আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, শিশুসাহিত্য, সাংবাদিকতা—সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তিনি রেখে গেছেন অমলিন স্বাক্ষর। সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ, মৃণাল সেন ও গৌতম ঘোষের মতো প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকাররা তাঁর রচনা অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ২০০৮ সালে তিনি ভারতের জাতীয় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি নির্বাচিত হন। দুই বাংলার পাঠকহৃদয়ে তিনি আজও সমানভাবে সমাদৃত—একজন লেখক হিসাবে যিনি ‘বাংলার আধুনিক চেতনাকে বহন করেছেন’।
শৈশব ও শিক্ষা: ফরিদপুরের মাটি থেকে কলকাতার আকাশ
১৯৩৪ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর (বাংলা ১৩৪১ সালের ২১শে ভাদ্র) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ফরিদপুর জেলার (বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার মাইজপাড়া গ্রামে) জন্মগ্রহণ করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । তাঁর পিতা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক । মাত্র চার বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানেই বড় হন । সেই সময়ে ব্যাংকের পিয়নের চেয়েও স্কুলশিক্ষকের বেতন ছিল কম—তাই তাঁর মা কখনো চাননি যে ছেলে শিক্ষকতা করুক ।
শিক্ষাজীবনে তিনি কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ, দমদম মতিঝিল কলেজ ও সিটি কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন । কিছুদিন অফিসে চাকরি করার পর তিনি সাংবাদিকতায় যোগ দেন । যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান কলকাতায় এলে সুনীলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়—সেই সূত্রে তিনি মার্কিন মুলুকে পড়তে যান এবং ডিগ্রি শেষে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপগ্রন্থাগারিক হিসাবেও কিছুদিন কাজ করেন ।
'কৃত্তিবাস': বাংলা কবিতায় নতুন প্রাণ
১৯৫৩ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর বন্ধুরা শুরু করেন ‘কৃত্তিবাস’ নামে একটি কবিতা পত্রিকা । এটি শুধু একটি পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এখানে প্রকাশিত হতো শুধু তরুণ কবিদের লেখা—যারা সাহসের সঙ্গে নতুন ছন্দ, নতুন ভাষা ও নতুন বিষয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। এই পত্রিকা বাংলা কবিতার জীবনানন্দ-পরবর্তী পর্যায়ে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিল। তিনি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন এবং দীর্ঘদিন এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সাহিত্যকীর্তি: দুই শতাধিক বইয়ের এক মহাসমুদ্র
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মোট ২০০-এরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা তাঁর অসাধারণ সাহিত্যিক উৎপাদনশীলতার প্রমাণ । লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে তাঁর ১৮০টিরও বেশি গ্রন্থ সংরক্ষিত আছে । সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তিনি সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন—কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ ও কলাম।
কবিতা: ‘নীরা’ সিরিজের অমর প্রেম
কবিতা ছিল তাঁর ‘প্রথম ভালোবাসা’ । ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ । তাঁর ‘নীরা’ সিরিজের কবিতাগুলো বিশেষভাবে জনপ্রিয়—যেখানে তিনি নীরা নামে এক কল্পিত নারীকে নিয়ে লিখেছেন প্রেমের অসাধারণ সব কবিতা। তাঁর ‘নিখিলেশ ও নীরা’ সিরিজ বাংলা ভাষায় অমর হয়ে আছে । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘যুগলবন্দী’ বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটি অনন্য সংযোজন ।
১৯৫৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর একে একে প্রকাশিত হয়—‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘রাত্রির রঁদেভূ’, ‘শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা’, ‘অর্ধেক জীবন’—প্রভৃতি ।
উপন্যাস: ইতিহাস থেকে সমসাময়িক জীবন
১৯৬৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকার দুর্গাপুজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ । এই উপন্যাসটি সমকালীন কলকাতার তরুণ সমাজের চিত্র এঁকেছিল এবং কিছু বিতর্কও তৈরি করেছিল । এর আগে ১৯৬৪ সালে তিনি ‘আত্মপ্রকাশ’ নামে দ্বিতীয় বইটি লেখেন—যা ‘দেশ’-এ প্রকাশিত প্রথম নবীন লেখকের বই হিসেবে ইতিহাস তৈরি করে ।
তাঁর তিনটি মহাকাব্যিক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে:
‘সেই সময়’ (১৯৮৫) — উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসটি ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার অর্জন করে । বাংলার সমাজ-বুদ্ধিজীবী জীবনকে তিনি এতে অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। গভীর গবেষণার ফল এই উপন্যাসটি প্রকাশের বহু বছর পরও বেস্টসেলার হিসেবে টিকে আছে ।
‘প্রথম আলো’ — ‘সেই সময়’-এর উত্তরসর্গ, বাংলার নবজাগরণের আরও গভীর চিত্রায়ন ।
‘পূর্ব পশ্চিম’ (১৯৮৯) — ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৬৭ সালের নকশাল আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—এই তিন ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিন প্রজন্মের বাঙালির গল্প । এই উপন্যাসের অনন্য আঙ্গিক পরবর্তীকালে অনেক বাংলাদেশি লেখককে অনুপ্রাণিত করেছে ।
২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’ ও ২০০৮ সালে ‘মনের মানুষ’ (লালন ফকিরের জীবনী) । ‘মনের মানুষ’ অবলম্বনে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ।
ছোটগল্প: ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ থেকে ‘অর্জুন’
ছোটগল্পেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রায়িত করেছেন । ‘অর্জুন’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের উৎস) তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা ।
ভ্রমণসাহিত্য: ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’
তাঁর ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের অপরূপ-ব্যতিক্রমী-বিশেষ সংযোজন । তাঁর ট্র্যাভেলগ ও গদ্য রচনাগুলোও বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ সংযোজন।
শিশুসাহিত্য: কাকাবাবু
শিশুসাহিত্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘কাকাবাবু’—এক প্রতিবন্ধী অভিযাত্রী, যার সঙ্গী তাঁর ভাইপো সন্তু ও বন্ধু জোজো । ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি এই সিরিজে ৩৫টির বেশি উপন্যাস রচনা করেছেন, যা ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতো ।
ছদ্মনাম ও ‘নীললোহিত’: নিজের একটি পৃথক সত্তা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীল উপাধ্যায়’—এই ছদ্মনামগুলো ব্যবহার করেছেন । নীললোহিতের মাধ্যমে তিনি নিজের একটি পৃথক সত্তা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন । নীললোহিতের সব কাহিনিতেই নীললোহিতই কেন্দ্রীয় চরিত্র—যে নিজেই কাহিনিটি বলে চলে আত্মকথার ভঙ্গিতে। সব কাহিনিতেই নীললোহিতের বয়স সাতাশ—সাতাশের বেশি তার বয়স বাড়ে না । বিভিন্ন কাহিনিতে দেখা যায় নীললোহিত চির-বেকার, চাকরিতে ঢুকলেও বেশিদিন টেকে না। তার বাড়িতে মা, দাদা, বৌদি রয়েছেন ।
তিনি অ্যালেন গিন্সবার্গের মতো প্রথিতযশা কবিদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। গিন্সবার্গ তাঁর ‘September on Jessore Road’ কবিতায় সুনীলের কথা উল্লেখ করেছেন, আর সুনীলও তাঁর লেখায় গিন্সবার্গের কথা স্বীকার করেছেন ।
পূর্ববর্তীশহরের গাছই কি বাড়াচ্ছে বায়ুদূষণ? নতুন গবেষণায় উঠে এলো চমকপ্রদ তথ্য
পরবর্তী শক্তি চট্টোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা কবিতার বাউণ্ডুলে পুরোহিত
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
