পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ মহাসাগর (Southern Ocean) এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই দুর্গম অঞ্চলের মেঘগুলো এখনও বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানের সবচেয়ে কম বোঝা বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি। সূর্যের আলো প্রবেশ ও তাপ নির্গমন—দুটোই নিয়ন্ত্রণ করে এই মেঘগুলো পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যকে (energy balance) প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। এমনকি তাদের প্রতিনিধিত্বে সামান্য ভুলও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জলবায়ু মডেল এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তাই বিজ্ঞানীদের জন্য এগুলো দীর্ঘদিনের এক চ্যালেঞ্জ।
এই মেঘগুলোকে এত কঠিন করে তোলার কারণগুলো বোঝার জন্য, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ পোলার রিসার্চ (জাপান) ও নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ৬৪তম জাপানি অ্যান্টার্কটিক গবেষণা অভিযানের (JARE64) সময় সংগ্রহ করা মেঘ পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণা জাহাজ আর/ভি শিরাসে-তে বসানো যন্ত্রপাতি দিয়ে ডিসেম্বর ২০২২ থেকে মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত নিরন্তর মেঘের বৈশিষ্ট্য, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা, পৃষ্ঠের বিকিরণ এবং অ্যারোসলের ঘনত্ব মাপা হয়েছে। এই তথ্যগুলো মডেলের কর্মক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বিস্তৃত মানদণ্ড (benchmark) হিসেবে কাজ করেছে।
মডেল বনাম বাস্তবতা: কোথায় ফারাক?
গবেষক দল দুটি বহুল ব্যবহৃত বায়ুমণ্ডলীয় পুনঃবিশ্লেষণ (reanalysis) ডেটাসেট—ERA5 এবং MERRA-2—এবং CAM-ATRAS জলবায়ু মডেলকে অভিযানের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যদিও তিনটিই দক্ষিণ মহাসাগরের মেঘের ধরণ broadly ধারণ করতে পেরেছে, গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা গেছে। ERA5 এবং MERRA-2 নিম্ন-স্তরের মেঘের উপস্থিতি বেশি মাত্রায় দেখিয়েছে (overestimated), অন্যদিকে CAM-ATRAS পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মিল রেখেছে—বিশেষ করে মেঘের উপস্থিতি ও মেঘের অবস্থা (cloud phase) পুনরুত্পাদনে।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে, প্রচুর নিম্ন-স্তরের মেঘ দেখানো সত্ত্বেও, তিনটি ডেটাসেটই পৃষ্ঠে পৌঁছানো নিম্নমুখী দীর্ঘ-তরঙ্গ বিকিরণ (downward longwave radiation)-এর পরিমাণ কমিয়ে দেখিয়েছে।
অতিরিক্ত বরফ, কম তাপ
পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, পুনঃবিশ্লেষণ ডেটাসেটগুলোতে বাস্তবের চেয়ে বেশি অ্যারোসল ঘনত্ব রয়েছে। তাই গবেষকরা CAM-ATRAS-এর সঙ্গে সংবেদনশীলতা পরীক্ষাও চালিয়েছেন, দক্ষিণ গোলার্ধে অ্যারোসল নির্গমন বাড়িয়ে দেখতে কীভাবে তা মেঘ গঠন ও পৃষ্ঠের বিকিরণকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু অ্যারোসল সংবেদনশীলতা পরীক্ষায় দেখা গেছে, অ্যারোসলের ঘনত্ব বাড়ালে নিম্ন-স্তরের মেঘ বেড়েছে, কিন্তু পৃষ্ঠের বিকিরণে খুব সামান্য প্রভাব পড়েছে। গবেষকরা এই অসামঞ্জস্যের কারণ খুঁজে পেয়েছেন মেঘের ভৌত বৈশিষ্ট্যে, শুধু মেঘের সংখ্যায় নয়। মডেলগুলিতে মেঘে অতিরিক্ত বরফ ছিল, যা পৃষ্ঠের দিকে তাপ নির্গমন কমিয়ে দিয়েছে। এই ফলাফলগুলো দেখায় যে, দক্ষিণ মহাসাগরের পৃষ্ঠের শক্তি বাজেট অনুকরণে শুধু মেঘের উপস্থিতি নয়, বরং মেঘের অবস্থা ও তাপমাত্রা সঠিকভাবে প্রতিফলিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ কমাতে পারে ভুল
দীর্ঘস্থায়ী মেঘ-সম্পর্কিত পক্ষপাতগুলোর জন্য দায়ী প্রক্রিয়াগুলো চিহ্নিত করে এই গবেষণা আবহাওয়া ও জলবায়ু মডেলের উন্নতিতে মূল্যবান দিকনির্দেশনা দিয়েছে। মেঘের মাইক্রোফিজিক্স, অ্যারোসল–মেঘ মিথস্ক্রিয়া এবং পরিবেশের সঠিক প্রতিনিধিত্ব ভবিষ্যতের উষ্ণায়ন, সমুদ্রের বরফ পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনশীলতার আরও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করবে।
গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই অগ্রগতি ধরে রাখতে শুধু দক্ষিণ মহাসাগর ও অ্যান্টার্কটিকা জুড়ে মেঘ পর্যবেক্ষণ বাড়ানো নয়, বরং মৌলিক বায়ুমণ্ডলীয় চলকগুলোর—বিশেষ করে তাপমাত্রার—পর্যবেক্ষণও বাড়াতে হবে, যাতে সংখ্যাসূচক মডেলগুলোর ‘ঠান্ডা পক্ষপাত’ (cold bias) কমানো যায়।
সহকারী অধ্যাপক কাজুতোশি সাতো বলেছেন, “অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ এখনও খুব কম, তাই সংখ্যাসূচক মডেলগুলোতে অ্যান্টার্কটিক বায়ুমণ্ডলের প্রতিনিধিত্বে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে না—এমন পর্যবেক্ষণগুলোকে সংখ্যাসূচক মডেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। যেমন, জাপানের শোওয়া স্টেশনের PANSY রাডারের পর্যবেক্ষণ, যা এখনও রুটিন আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয় না, তা মডেলের পক্ষপাত কমাতে ও পূর্বাভাসের নির্ভুলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।” এই গবেষণা দক্ষিণ মহাসাগরের মেঘ ও বিকিরণ অনুকরণের অন্যতম বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক মূল্যায়ন। কেন বর্তমান মডেলগুলো এই মেঘগুলো অনুকরণে হিমশিম খাচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের পক্ষপাতগুলোর জন্য কোন প্রক্রিয়াগুলো দায়ী—তা চিহ্নিত করে, এই ফলাফল আরও নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস, উন্নত জলবায়ু মডেল এবং পৃথিবীর পরিবর্তনশীল জলবায়ু সম্পর্কে আরও আত্মবিশ্বাসী পূর্বাভাসের পথ তৈরি করেছে।