সৌরজগতের অন্যতম রহস্যময় গ্রহ শুক্র (Venus)। আকার-আকৃতিতে এটি পৃথিবীর ‘যমজ’ নামে পরিচিত—কারণ ব্যাস, ভর ও ঘনত্বের দিক থেকে এরা প্রায় একই রকম। কিন্তু এই সাদৃশ্য যেখানে শেষ হয়, সেখানেই শুরু হয় বিস্ময়। শুক্রের ঘূর্ণন দিক উল্টো (পৃথিবী ও অন্যান্য অধিকাংশ গ্রহের বিপরীতে), এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা এত বেশি (প্রায় ৪৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) যে সীসা পর্যন্ত গলে যায়, আর সবচেয়ে বড় রহস্য—শুক্রের কোনো চাঁদ নেই। পৃথিবী যেমন তার চাঁদকে ধরে রেখেছে, মঙ্গল যেমন ফোবোস ও ডেইমোসকে ধরে রেখেছে, শুক্র কেন একেবারে নিঃসঙ্গ? বিজ্ঞানীরা দশকের পর দশক ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। কখনো কি শুক্রের চাঁদ ছিল? নাকি কখনোই হয়নি? নতুন এক গবেষণা সেই রহস্যের সমাধানের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে—যদিও চূড়ান্ত ও নিশ্চিত উত্তর এখনও বাকি।
কীভাবে গবেষণা করা হয়েছে?
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্টিভেন আর. কেন-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক কম্পিউটার সিমুলেশন চালিয়েছেন। তারা শুক্রের ঘূর্ণন গতি, একটি কল্পিত চাঁদের ভর, তার কক্ষপথের দূরত্ব এবং গ্রহের অভ্যন্তরীণ জোয়ার-সংক্রান্ত ঘর্ষণ—এসব তথ্যকে একটি অত্যাধুনিক কম্পিউটার মডেলে ফিড করে ৪.৫ বিলিয়ন বছর সময় ধরে সিমুলেশন চালিয়েছেন। গবেষকরা বিভিন্ন শর্তে সিমুলেশন চালিয়ে দেখেছেন—কোন পরিস্থিতিতে চাঁদ টিকে থাকতে পারে, আর কোনটিতে ধ্বংস হয়ে যায়। তারা কয়েকটি মূল চলক (variable) পরিবর্তন করেছেন, যেমন চাঁদের সম্ভাব্য ভর, শুক্রের প্রাথমিক ঘূর্ণন গতি এবং জোয়ারজনিত বিকিরণের মাত্রা, যাতে দেখা যায় কোন কোন পরিস্থিতি চাঁদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে আর কোন কোনটি তার ধ্বংস ডেকে আনে। তারা দেখেছেন, চাঁদের ভর ও শুক্রের প্রাথমিক ঘূর্ণন গতির ওপর এর ভাগ্য নির্ভর করে। কিছু শর্তে চাঁদ ৪.৫ বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে পারত, আবার অন্য শর্তে তা ধ্বংস হয়ে যেত—এবং তা কখনো কখনো চাঁদ গঠনের মাত্র ৩ কোটি বছরের মধ্যেই ঘটে যেত।
সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী?
গবেষকদের মতে, শুক্রের চাঁদ সম্ভবত আস্তে আস্তে ভেতরের দিকে সর্পিলাকারে (spiral inward) এসে গ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষে ধ্বংস হয়েছে। এই ধ্বংস প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য জোয়ার-সংক্রান্ত মিথস্ক্রিয়ার বিষয়টি বোঝা জরুরি। কোনো চাঁদ যখন একটি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে, তখন গ্রহের মাধ্যাকর্ষণের কারণে চাঁদের অভ্যন্তরেও জোয়ার সৃষ্টি হয়। আবার চাঁদের মাধ্যাকর্ষণও গ্রহের ঘূর্ণনে প্রভাব ফেলে। এই পারস্পরিক টান—যাকে 'টাইডাল বিবর্তন' (tidal evolution) বলে—চাঁদের কক্ষপথের পরিবর্তন ঘটায়। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে এই টান চাঁদকে গ্রহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় (যেমন পৃথিবীর চাঁদ প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে), আবার অন্য পরিস্থিতিতে তা চাঁদকে গ্রহের দিকে টেনে নিয়ে আসে। শুক্রের ক্ষেত্রে, গবেষণায় দেখা গেছে, চাঁদ প্রথমে বাইরের দিকে সরে গেলেও পরে শুক্রের ঘূর্ণনের পরিবর্তনের কারণে তার কক্ষপথ উল্টে যায় এবং তা গ্রহের দিকে ধাবিত হয়। চাঁদের ভর ও শুক্রের প্রাথমিক ঘূর্ণনের ওপর নির্ভর করে এই ধ্বংস ঘটতে পারে চাঁদ গঠনের ৩ কোটি থেকে ১৭০ কোটি বছর পরে। গবেষকরা তাদের গবেষণাপত্রে লিখেছেন, “শুক্রের চাঁদের অনুপস্থিতি কোনো বড় দুর্ঘটনা বা বহিঃস্থ সংঘর্ষের ফল নয়; বরং এটি প্রাথমিক অবস্থারই স্বাভাবিক পরিণতি।” অর্থাৎ, কোনো দৈত্যাকার গ্রহের ধাক্কা বা অন্য কোনো বিধ্বংসী ঘটনার প্রয়োজন ছিল না—চাঁদটি শুরু থেকেই ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল, শুক্রের নিজস্ব ঘূর্ণন বৈশিষ্ট্যের কারণেই।
পৃথিবী-শুক্রের পার্থক্যের রহস্য
এই গবেষণা হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারে কেন পৃথিবী ও শুক্র এত ভিন্ন—যদিও তারা আকার ও ঘনত্বে একরকম। গবেষকরা তাদের গবেষণাপত্রে প্রশ্ন তুলেছেন, “শুক্রের প্রাথমিক ইতিহাসে চাঁদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কি এই পার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা বিন্দু?” উত্তর হয়তো ‘হ্যাঁ’। পৃথিবীর চাঁদ যেমন আমাদের জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রণ করে, পৃথিবীর অক্ষের ঢালকে স্থিতিশীল রাখে (যার ফলে মৌসুমী আবহাওয়া সৃষ্টি হয়), এবং সম্ভবত প্রাথমিক জীবনের বিবর্তনেও ভূমিকা রেখেছে—তেমনই শুক্রে চাঁদের অনুপস্থিতি হয়েছিল তার বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্রাঞ্চ পয়েন্ট’ (শাখা বিন্দু)। চাঁদ ছাড়া শুক্রের ঘূর্ণন অক্ষ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা এর চরম জলবায়ু ও ধীর ঘূর্ণনের জন্য আংশিকভাবে দায়ী হতে পারে। গবেষণাটি প্রিন্ট সার্ভার arXiv-এ প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনও পিয়ার-রিভিউ হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে শুক্রের চাঁদ-বিহীন রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে আরও জটিল সিমুলেশন এবং শুক্রের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে আরও সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে এই অনুমান আরও শক্তিশালী হবে। ততদিন পর্যন্ত, শুক্রের এই রহস্য বিজ্ঞানীদের কৌতূহল উসকে দিতে থাকবে।