বেগম রোকেয়া: যে নারী অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন
বেগম রোকেয়া
বাংলা সাহিত্য ও সমাজের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁদের জীবনই হয়ে ওঠে এক প্রেরণার মহাকাব্য। তাঁরা সময়ের চেয়ে অনেক আগে থেকেছেন, সমাজের রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভেঙে নতুন পথ তৈরি করেছেন। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী মানুষ—একাধারে সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও নারীজাগরণের অগ্রদূত । ইংরেজি সাহিত্যের কিংবদন্তি ভার্জিনিয়া উল্ফ বা সিমোন দ্য বোভোয়ারও হয়তো তাঁর বহুমাত্রিক সংগ্রামের কাছে তিলকিত হতেন ।
শৈশব ও শিক্ষা: নিষেধের মাঝে জ্ঞানের তৃষ্ণা
১৮৮০ সালের ৯ই ডিসেম্বর (বাংলা ১২৮৭ সালের ২৫ অগ্রহায়ণ) ব্রিটিশ ভারতের রংপুর জেলার পায়েরাবন্দ গ্রামে এক অভিজাত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন । পিতা জহিরুদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ছিলেন একাধিক ভাষায় দক্ষ একজন বুদ্ধিজীবী—আরবি, উর্দু, ফার্সি, বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে তাঁর দখল ছিল । কিন্তু বিড়ম্বনা, এই বহুভাষাবিদ পিতা নিজের মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে রাজি ছিলেন না। তখনকার উচ্চশ্রেণীর মুসলিম সমাজের রীতি ছিল—মেয়েদের শিক্ষা শুধু ঘরের চারদেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, আরবি-উর্দু-ফার্সি পড়ানো হবে, কিন্তু বাংলা ও ইংরেজি নয় ।
রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বড় বোন করিমুন্নেসা তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন । করিমুন্নেসা বাংলা ভাষায় পড়তে চাইতেন, যা উচ্চশ্রেণীর মুসলিম সমাজে "লজ্জাজনক" বলে বিবেচিত হতো । গোটা পরিবার যখন নিদ্রামগ্ন, সেই নিস্তব্ধ রাতে ইব্রাহিম লুকিয়ে রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে বাংলা ও ইংরেজি পড়াতেন । আত্মীয়-স্বজনরা এই শিক্ষার বিরোধিতা করতেন, এমনকি রোকেয়ার পড়াশোনার আগ্রহকে গালিগালাজ পর্যন্ত করতেন । কিন্তু ভাই আর বোন দুজনেই ছিলেন অবিচল।
করিমুন্নেসাকে যখন মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বাল্যবিবাহ দিয়ে দেওয়া হয়, তখন রোকেয়ার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয় । তিনি পরে লিখেছিলেন: "যদি সমাজ এত দমনমূলক না হতো, করিমুন্নেসা এই দেশের এক উজ্জ্বল রত্ন হতে পারতেন। যেমন একটি বৈদ্যুতিক বাল্বের আভা ঘন আবরণে ম্লান হয়ে যায়, তেমনই পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকার কারণে আমার বোন তাঁর প্রতিভা দেখাতে পারেননি" । এই ঘটনাই বোধহয় রোকেয়ার মনে সমাজ পরিবর্তনের বীজ বপন করেছিল।
বিবাহ: স্বামীই প্রথম পৃষ্ঠপোষক
১৮৯৮ সালে মাত্র ষোল বছর বয়সে রোকেয়ার বিবাহ হয় সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে । তিনি ছিলেন বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট—উর্দুভাষী, কিন্তু অত্যন্ত উদারমনা ও প্রগতিশীল । সাখাওয়াত হোসেন ইংল্যান্ড থেকে বিএ পাস করেছিলেন এবং রয়্যাল এগ্রিকালচারাল সোসাইটির সদস্য ছিলেন । তিনি রোকেয়ার ভাইয়ের কাজ চালিয়ে যান—স্ত্রীকে বাংলা ও ইংরেজি শিখতে উৎসাহ দেন, বিদেশি সাহিত্য পড়তে বলেন ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি রোকেয়াকে লেখালেখি করতে বলেন এবং বাংলাকে তাঁর প্রধান সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন—কারণ এটি সাধারণ মানুষের ভাষা । এই পরামর্শ রোকেয়ার সাহিত্যযাত্রাকে এক নতুন দিক দিয়েছিল। ১৯০২ সালে তিনি তাঁর প্রথম প্রবন্ধ 'পিপাসা' প্রকাশ করেন ।
তবে এই সুখের সংসার ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯০৯ সালের ৩রা মে স্বামী মৃত্যুবরণ করেন । তাঁদের দুই কন্যা শৈশবেই মারা গিয়েছিল । ব্যক্তিগত শোকে ভেঙে পড়ার পরিবর্তে রোকেয়া তাঁর স্বামীর দেওয়া ১০,০০০ টাকা (সে সময়ের জন্য বিরল একটি অঙ্ক) নিয়ে নারীশিক্ষার জন্য কাজ শুরু করেন ।
সাহিত্যকর্ম: কলম যেখানে অস্ত্র হয়ে উঠল
স্বামীর উৎসাহে ১৯০২ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশক ধরে তিনি নিরলসভাবে লিখে গেছেন । তাঁর লেখার মূল লক্ষ্য ছিল নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন—কিন্তু তিনি তা করতেন ব্যঙ্গ, রূপক ও কল্পনার অসাধারণ কৌশলে । তাঁর সাহিত্য যেমন বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি সমাজ বদলেরও অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
'সুলতানার স্বপ্ন': নারীশাসিত ইউটোপিয়া
'সুলতানার স্বপ্ন' (Sultana's Dream) রোকেয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা । ১৯০৫ সালে ইংরেজিতে লেখা এই রচনাটি পরবর্তীতে তিনি নিজেই বাংলায় অনুবাদ করেন । এটি কেবল বাংলা সাহিত্যেরই নয়, বিশ্বসাহিত্যের প্রথম দিকের নারীবাদী সায়েন্স ফিকশনগুলোর একটি ।
গল্পের পটভূমি: 'লেডিল্যান্ড' নামে এক কল্পনার দেশ—যেখানে পুরো শাসনভার নারীরা। পুরুষরা পর্দায় আবদ্ধ, আর নারীরা পরিচালনা করছেন প্রশাসন, বিজ্ঞান, শিক্ষা—সবকিছু । এই দেশে রয়েছে অপরাধহীন, শান্তিপূর্ণ সমাজ; বিজ্ঞান ব্যবহার করা হয় ধ্বংসের জন্য নয়, কল্যাণের জন্য; সৌরশক্তিতে চলে সবকিছু ।
এই গল্পের মধ্য দিয়ে রোকেয়া পিতৃতান্ত্রিক সমাজের গোড়া ভিত্তিকে প্রশ্ন করেছেন—পুরুষদের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে তিনি ভেঙে দিয়েছেন সিস্টার সারা চরিত্রের মাধ্যমে, যে আধুনিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি, সামরিক কৌশল—সবকিছুতে পারদর্শী । একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন, নারীদের স্বাধীনতা ও শিক্ষা দিলে কী এক অপূর্ব পৃথিবী গড়ে উঠতে পারে।
'পদ্মরাগ' ও অন্যান্য রচনা
'পদ্মরাগ' (১৯২৪) ছিল তাঁর উপন্যাস । এখানে তিনি কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে বাংলার নারীদের যে নানাবিধ কষ্ট ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তার বাস্তব চিত্র এঁকেছেন ।
'অবরোধবাসিনী' (১৯৩১) ছিল সবচেয়ে সাহসী রচনাগুলোর একটি । এতে তিনি পর্দা প্রথাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন, দেখিয়েছেন কীভাবে এই প্রথা নারীর জীবন, আত্মমর্যাদা ও পরিচয়কে বিপন্ন করে ।
'মতিচূর' (১৯০৫ ও ১৯২২) ছিল তাঁর প্রবন্ধ সংকলন—দুই খণ্ডে তাঁর নারীবাদী চিন্তার সম্পূর্ণ ভাণ্ডার ।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা:
'নারীর অধিকার'—অসমাপ্ত রচনা, যা শেষ পর্যন্ত তিনি লিখে যেতে পারেননি; ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর দিন লেখার টেবিলেই এটি অসমাপ্ত অবস্থায় পাওয়া যায় ।
শিক্ষা আন্দোলন: স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া
রোকেয়া শুধু স্বপ্ন দেখেননি; তিনি তা বাস্তবায়িত করেছিলেন। নারীর মুক্তির একমাত্র পথ হলো শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা—এই উপলব্ধি থেকে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন ।
সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল
১৯০৯ সালের ১লা অক্টোবর, স্বামীর মৃত্যুর মাত্র পাঁচ মাস পর, তিনি ভাগলপুরে (বর্তমান বিহার) মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । স্বামীর নামে এর নাম রাখেন 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' ।
কিন্তু স্বামীর পরিবারের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে ১৯১১ সালে তিনি স্কুলটি কলকাতায় স্থানান্তর করেন—ওয়ালিউল্লাহ লেনের ১৩ নম্বর বাড়িতে, মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে । সেখান থেকে স্কুলটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছিল—১৯৩১ সালে ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে, ১৯৩২ সালে লোয়ার সার্কুলার রোডে, ১৯৩৮ সালে লর্ড সিনহা রোডে—তবুও তিনি থেমে থাকেননি ।
এই স্কুলটি ১৯১৭ সালে মিডল ইংলিশ স্কুল এবং ১৯৩১ সালে হাই ইংলিশ স্কুলে উন্নীত হয় । রোকেয়া ২৪ বছর ধরে এই স্কুল চালিয়েছেন—যে সময়ে মুসলিম অভিভাবকরা মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে দ্বিধা করতেন, তিনি নিজেই ঘরে ঘরে গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন ।
বিশেষ বিষয়: তিনি অভিভাবকদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে স্কুলে পর্দা প্রথা বজায় রাখা হবে; মেয়েদের জন্য ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে তারা নিরাপদে পর্দায় থেকে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে । স্কুলের পাঠ্যক্রমে ছিল বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি, হোম নার্সিং, প্রাথমিক চিকিৎসা, রান্না, সেলাই, শারীরিক শিক্ষা, সংগীত—একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার ব্যবস্থা । সেসময় দক্ষ নারী শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর ছিল, তাই তিনি নিজেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতেন ।
অঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম
শুধু স্কুল প্রতিষ্ঠাই যথেষ্ট নয়—জনমত গঠনের জন্য সংগঠনও প্রয়োজন। ১৯১৬ সালে তিনি 'অঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম' (ইসলামিক উইমেন অ্যাসোসিয়েশন) প্রতিষ্ঠা করেন । এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পক্ষে সম্মেলন ও বিতর্কের আয়োজন করতেন । রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, অতি রক্ষণশীলতাই ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার প্রধান কারণ—এবং তিনি কুরআনের মূল শিক্ষার ভিত্তিতে সমাজ সংস্কারের পক্ষে ছিলেন ।
রাজনৈতিক সচেতনতা ও নারীবাদী চেতনা
রোকেয়া শুধু কলম আর স্কুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি রাজনৈতিকভাবেও সচেতন ছিলেন এবং নারীদের সংগঠিত না করলে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়িত হবে না—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি কাজ করেছেন ।
তাঁর অনেক রচনায় সমকালীন রাজনীতি, উপনিবেশবাদ ও পিতৃতন্
জসীম উদ্দীন: পল্লীকবি যিনি গ্রামের মুখে শিখিয়েছিলেন শহুরে সাহিত্য
পরবর্তীহুমায়ূন আজাদ: যে বিদ্রোহী কলম ভাষাকে রক্ষা করেছিল আর সমাজকে প্রশ্ন করেছিল
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
