হুমায়ূন আজাদ: যে বিদ্রোহী কলম ভাষাকে রক্ষা করেছিল আর সমাজকে প্রশ্ন করেছিল
হুমায়ূন আজাদ

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা তাঁদের লেখার মাধ্যমেই সমাজের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছেন। যাঁরা প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, নিজের চিন্তাকে নির্ভীকভাবে প্রকাশ করেছেন, আর এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে তাঁদের জীবন দিয়ে। হুমায়ূন আজাদ ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। যাঁকে একাধারে বলা যায় কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক ও চিন্তাবিদ । সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তিনি রেখেছেন অমলিন স্বাক্ষর। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো নির্ভীক চিন্তাবিদ—যিনি কখনো কারও কাছে মাথা নত করেননি, বলেননি যা সমাজের দেখানো পথে হাঁটা উচিত। বরং তিনি নিজের পথ নিজেই বেছে নিয়েছিলেন, আর সেই পথ ছিল ভাষার সেবা ও সমাজের বদলের পথ।
শৈশব ও শিক্ষা: বিক্রমপুরের মাটি থেকে এডিনবরা পর্যন্ত
১৯৪৭ সালের ২৮শে এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলা) রারিখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আজাদ । পিতা আব্দুর রশীদ ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক, মাতা জোবেদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। তাঁর আসল নাম ছিল হুমায়ূন কবির; পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তিনি নাম পরিবর্তন করে রাখেন হুমায়ূন আজাদ ।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯৬২ সালে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক পাস করেন । ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন । এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৬৭ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন—উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে ।
শিক্ষাজীবনে তাঁর অসাধারণ মেধা ও ভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ তাকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে নিয়ে যায়। ১৯৭৬ সালে তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন । বাংলা ভাষার সর্বনামীকরণ (Pronominalisation) নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল অসাধারণ। ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি তাঁর গবেষণাকে ‘Pronominalisation in Bengali’ (১৯৮৩) বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেন, যা বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ।
কর্মজীবন: শিক্ষকতা ও সাহিত্য সৃষ্টি
হুমায়ূন আজাদ ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন । ১৯৭০ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন । ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন । ১৯৭৮ সালের ১লা নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৬ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন ।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিরলসভাবে সাহিত্য সৃষ্টি করে গেছেন। মোট ৭০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি—যার মধ্যে রয়েছে কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা গ্রন্থ, সম্পাদনা গ্রন্থ এবং শিশুসাহিত্য ।
ভাষাবিদ হিসেবে অবদান: বাংলা ভাষার সেবক
হুমায়ূন আজাদকে বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের একজন অগ্রণী গবেষক হিসেবে গণ্য করা হয় । এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে ফিরে এসে তিনি বাংলা ভাষার গঠন, ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর ভাষাবিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
‘বাংলা ভাষার শত্রু-মিত্র’ (১৯৮৩) — বাংলা ভাষার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ
‘Pronominalisation in Bengali’ (১৯৮৩) — পিএইচডি গবেষণার উপর ভিত্তি করে রচিত
তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘বাংলা ভাষা’ (দুই খণ্ড) , যা বাংলা ভাষার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমগ্র । ভাষাবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (ভাষাবিজ্ঞান শাখা) অর্জন করেন ।
‘কতো নদী সরোবর’: বাংলা ভাষার জীবনকথা
হুমায়ূন আজাদের ‘কতো নদী সরোবর’ (১৯৮৭) গ্রন্থটি বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে রচিত। এই বইটি ‘বাংলা ভাষার জীবনী’ নামেও পরিচিত । গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় উপমা হলো—বাংলা ভাষার নিজস্ব একটি ‘জীবনকথা’ রয়েছে, যা ভাষার জন্ম, বিবর্তন এবং বিভিন্ন ভাষার সঙ্গে সংঘর্ষ ও মেলবন্ধনের ইতিহাসকে ধারণ করে । তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি থেকে শুরু করে হাজার বছরের যাত্রাপথকে—চর্যাপদের রহস্যময় পঙক্তি থেকে বৈষ্ণব পদাবলির ভক্তিরস, মঙ্গলকাব্যের আখ্যান, বিদ্যাসাগরের গদ্য সংস্কার ও রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষা—সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে তুলে ধরেছেন ।
এই গ্রন্থটি ‘জীবন্ত প্রাণীর মতো ভাষার বিবর্তন’ ধারণার জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত। তিনি ভাষার ধ্বনিগত পরিবর্তনকে উপমা ও রূপকের মাধ্যমে এত প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন করেছেন যে ভাষাবিজ্ঞানের জটিল বিষয়ও সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে । তিনি বাংলা ভাষার সংকর বৈশিষ্ট্যকে উদযাপন করেছেন—যেখানে ফার্সি-আরবি শব্দের সমাগম বাংলাকে যেমন শক্তিশালী করেছে, তেমনি ভাষাটি তার স্বকীয়তা হারায়নি ।
এই বইটি তাঁর ভাষাবিদ হিসেবে দক্ষতার পাশাপাশি সাহিত্যিক প্রতিভারও এক অসাধারণ উদাহরণ।
সাহিত্যকীর্তি: কবিতা, উপন্যাস, সমালোচনা
কবিতা
হুমায়ূন আজাদের কবিতার যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে ‘অলৌকিক ইস্তিমার’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে । তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলো চিতাবাঘ’ (১৯৮০) । এরপর প্রকাশিত হয় ‘যতোই গভীরে যাই মধু যতোই উপরে যাই নীল’ (১৯৮৭) , ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যের সময়ে’ (১৯৯০) , ‘কফনে মরা অশ্রুবিন্দু’ (১৯৯৮) ইত্যাদি । তাঁর কবিতার ভাষা যেমন শক্তিশালী, তেমনি তাঁর উপস্থাপনায় রয়েছে এক অনন্য নিখাদ সৌন্দর্য ।
উপন্যাস
১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’ , যা বাংলাদেশের সামরিক শাসনের পটভূমিতে রচিত । এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ (১৯৯৫) , ‘মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ’ (১৯৯৬) , ‘জাদুকরের মৃত্যু’ (১৯৯৬) , ‘কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ’ (১৯৯৯) , ‘নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু’ (২০০০) , ‘ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ’ (২০০১) , ‘শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা’ (২০০২) ইত্যাদি ।
সাহিত্য সমালোচনা
হুমায়ূন আজাদ সাহিত্য সমালোচনার জগতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর সমালোচনামূলক গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শামসুর রহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা’ (১৯৮৩) , ‘বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ (১৯৮৮) , ‘ভাষা আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি’ (১৯৯০) , ‘সীমানদ্ধতার সূত্র’ (১৯৯৩) , ‘আমার অবিশ্বাস’ (১৯৯৭) , ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’ (২০০৩) ।
বাংলা সাহিত্য সমালোচনায় তিনি এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিলেন, যেখানে তিনি প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে দ্বিধা করতেন না। ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর দখল তাঁকে এই ক্ষেত্রে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
শিশুসাহিত্য
শুধু প্রবীণ পাঠকদের জন্যই নয়, তিনি শিশু-কিশোরদের জন্যও লিখেছেন অসাধারণ সব বই। তাঁর শিশুসাহিত্যের মধ্যে ‘লাল-নীল দ্বীপাবলি’ (১৯৭৬) , ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ (১৯৮৫) , ‘আব্বুকে মনে পড়ে’ (১৯৮৯) , ‘বুকপকেটে জোনাকিপোকা’ (১৯৯৩) উল্লেখযোগ্য । তাঁর শিশুসাহিত্য যেমন উপদেশমূলক, তেমনি সহজ-সরল ভাষায় লেখা যা শিশুমনকে আকৃষ্ট করে।
‘নারী’ : প্রথম নারীবাদী গ্রন্থ ও নিষিদ্ধকরণ
১৯৯২ সালে হুমায়ূন আজাদ প্রকাশ করেছিলেন ‘নারী’ গ্রন্থটি । এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নারীবাদী গ্রন্থ । গ্রন্থে তিনি নারীর প্রতি সমাজের পিতৃতান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি যেমন রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নারী-বান্ধব ভূমিকার প্রশংসা করেছেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নারীবিরোধী মনোভাবেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন ।
গ্রন্থটি প্রকাশের পর রক্ষণশীল মহল থেকে
বেগম রোকেয়া: যে নারী অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন
পরবর্তীহুমায়ূন আহমেদ: বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পকার, যে একাই সৃষ্টি করেছিল এক মহাবিশ্ব
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
