গবেষকরা হয়তো খুঁজে পেয়েছেন ডার্ক ম্যাটার-এর প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ—নাকি তা কেবল একটি এলোমেলো ঘটনা? উত্তেজনা বাড়িয়েই রেখেছে ২০২৬ সালের জুনে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার স্যানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফ্যাসিলিটিতে অবস্থিত LUX-ZEPLIN (LZ) ডিটেক্টর, যা মাটির ১.৫ কিলোমিটার নিচে অবস্থিত, সেটি একটি অস্বাভাবিক সংকেত ধরে। মহাবিশ্বের রহস্যময় এই অদৃশ্য পদার্থের সন্ধান বহু বছর ধরে চললেও, সরাসরি কোনো প্রমাণ কখনো মেলেনি। কিন্তু LZ-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীমহলে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। তবে সতর্ক থাকারও কারণ আছে—কারণ এই ঘটনা মাত্র একটি, এবং তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্যের প্রয়োজন।
ডার্ক ম্যাটার: মহাবিশ্বের অদৃশ্য শাসক
মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ৮৫% হলো ডার্ক ম্যাটার। এর অস্তিত্ব আমরা জানি মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে—ছায়াপথগুলোর ঘূর্ণন, আলোর বেঁকে যাওয়া, মহাবিশ্বের বিবর্তন—সব কিছুই ডার্ক ম্যাটার-এর উপস্থিতি প্রমাণ করে। কিন্তু এই পদার্থ নিজে কোনো আলো, তাপ বা তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ নির্গত করে না, তাই সরাসরি তা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।
বিজ্ঞানীদের প্রধান অনুমান হলো—ডার্ক ম্যাটার তৈরি হতে পারে WIMP (Weakly Interacting Massive Particles)-এর মতো কণা দিয়ে। এই কণাগুলো সাধারণ পদার্থের সঙ্গে খুব দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে, তাই তাদের খুঁজে পাওয়া এত দুরূহ।
LZ ডিটেক্টর: অন্ধকারের সন্ধানে সাড়া
LZ ডিটেক্টরটি মূলত তরল xenon (লিকুইড জেনন) দিয়ে ভরা একটি বিশাল ট্যাঙ্ক। যখন কোনো WIMP কণা xenon নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে (collide) আসে, তখন দুটি সংকেত তৈরি হয়:
১. ফ্ল্যাশ অফ লাইট—সংঘর্ষের ফলে xenon নিউক্লিয়াস থেকে আলোর ঝলক বের হয়, যা ডিটেক্টরের সেন্সরগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করে।
২. ইলেকট্রনের মুক্তি—সংঘর্ষের ফলে কিছু ইলেকট্রন মুক্ত হয়, যা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সাহায্যে উপরের দিকে চালিত হয় এবং দ্বিতীয় আলোক সংকেত তৈরি করে।
এই দুইটি সংকেতের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে ঘটনাটি কোনো পরিচিত কণার কারণে ঘটেছে, নাকি ডার্ক ম্যাটার-এর ইঙ্গিত বহন করছে।
সেই একক ঘটনা: কী ঘটেছিল ২০২৩ সালের জুনে?
LZ দল ২২০ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখে যে, পরিচিত কণার কারণে ঘটে যাওয়া ঘটনার (ব্যাকগ্রাউন্ড ইভেন্ট) সম্ভাবনা মাত্র ১%। অর্থাৎ, এই ঘটনাটি যদি ডার্ক ম্যাটার-এর কারণে হয়ে থাকে, তবে তা ২.৬ সিগমা (sigma) স্তরের একটি সংকেত। পদার্থবিজ্ঞানে কোনো আবিষ্কার দাবি করতে সাধারণত ৫ সিগমা স্তরের প্রয়োজন হয়, আর ৩ সিগমা স্তরে ‘প্রমাণ’ (evidence) বলা যায়। তাই এই ঘটনা এখনও নিশ্চিত কোনো আবিষ্কার নয়, তবে এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ যে বিজ্ঞানীরা এর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, ঘটনাটি ঘটেছে জুন মাসে—যখন পৃথিবী তার কক্ষপথে এমন অবস্থানে থাকে যে এটি ডার্ক ম্যাটার-এর প্রবাহের সঙ্গে বেশি সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। গ্রীষ্মকালে এই ধরনের উচ্চ-শক্তির সংঘর্ষের সম্ভাবনা বেশি থাকে, তাই জুন মাসের এই ঘটনাকে অনেক গবেষক গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ? সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
যদি এই ঘটনাটি সত্যিই ডার্ক ম্যাটার-এর হয়, তবে তা WIMP-এর সহজ সংস্করণের চেয়ে কিছুটা জটিল। যেমন—ডার্ক ম্যাটার-এর বিভিন্ন শক্তিস্তর থাকতে পারে, যা সংঘর্ষের শক্তিকে প্রভাবিত করে। এই ধারণাটি নতুন নয়, বরং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই এমন মডেল নিয়ে কাজ করছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাথু রিস বলেছেন, “এটা কোনো পাগলাটে সংকেত নয়—বরং বেশ যুক্তিসঙ্গত, যা আমাকে কিছুটা আশাবাদী করে তুলছে।”
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী উইক হ্যাক্সটন মনে করছেন, এই ঘটনা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ তৈরি হবে। তবে উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান হুপার সতর্ক করেছেন, “এটি মাত্র একটি ঘটনা, তাই আসলে কী ঘটছে, তা বলা মুশকিল। তবে হ্যাঁ, এটি কৌতূহলোদ্দীপক।”
ইতিহাসে ‘ফলো-আপ’ না পাওয়ার ঘটনা
ডার্ক ম্যাটার-এর সন্ধানে আগেও মাঝেমধ্যে উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটেছে, যা পরে আরও তথ্য যোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হয়ে গেছে। ২০২০ সালে XENON1T ডিটেক্টরে একটি অস্বাভাবিক সংকেত পাওয়া গিয়েছিল, যা পরে XENONnT-এর আরও বিশদ পর্যবেক্ষণে বাতিল হয়ে যায়। তাই LZ-এর এই সংকেত নিয়েও বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত নন, বরং আরও তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সামনের পথ: আরও তথ্য সংগ্রহ
LZ ডিটেক্টর ইতিমধ্যে আরও তিনগুণ তথ্য সংগ্রহ করেছে, যা এখনও বিশ্লেষণ করা হয়নি। যদি সত্যিই ডার্ক ম্যাটার এই ঘটনার কারণ হয়ে থাকে, তবে সেই তথ্যে আরও অনুরূপ ঘটনা থাকার কথা। পরবর্তী বিশ্লেষণগুলো হয়তো এই রহস্যের সমাধান দিতে পারে—নাকি এটি আরেকটি ‘মিথ্যা ইঙ্গিত’ হিসেবে প্রমাণিত হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
শেষ কথা: অন্ধকারের পথে আরেকটি ধাপ
ডার্ক ম্যাটার-এর সরাসরি শনাক্তকরণ পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বৃহৎ চ্যালেঞ্জ। LZ-এর এই ঘটনা হয়তো তার সমাধান নয়, কিন্তু এটি আমাদের আরও কাছে নিয়ে এসেছে। এমনকি যদি এটি ডার্ক ম্যাটার না-ও হয়, তবুও এটি প্রমাণ করে যে LZ-এর মতো ডিটেক্টরগুলি অজানা কণার সন্ধানে কার্যকরী। আর সেই কারণেই বিজ্ঞানীরা আশাবাদী—একদিন হয়তো এই অদৃশ্য পদার্থ আমাদের চোখের সামনে ধরা পড়বেই।