ম্যালেরিয়া টিকা: একটি প্রাচীন ঘাতকের বিরুদ্ধে নতুন অস্ত্র
Prominent Vaccine

২০২১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রথম ম্যালেরিয়া টিকা RTS,S/AS01 (Mosquirix) সুপারিশ করে—এটি ছিল ৩০ বছরের গবেষণার ফল। এরপর ২০২৩ সালে দ্বিতীয় টিকা R21/Matrix-M অনুমোদিত হয়, যা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া তৈরি করেছে। R21-এর কার্যকারিতা RTS,S-এর চেয়ে বেশি—সাম্প্রতিক ট্রায়ালে ৭৫% (মৌসুমি অঞ্চলে) এবং ৬৮% (সারা বছর সংক্রমণ হয় এমন অঞ্চলে) । ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৫টি আফ্রিকান দেশ তাদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ম্যালেরিয়া টিকা অন্তর্ভুক্ত করেছে । কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চতুর্থ ডোজ—যা অনেক শিশু পায় না, ফলে সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয় না ।
ম্যালেরিয়া: একটি প্রাচীন ঘাতক
ম্যালেরিয়া হাজার হাজার বছর ধরে মানবসভ্যতার সঙ্গী। মিশরীয় মমি, প্রাচীন চীনা লিখিত নথি, এমনকি গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসও এই রোগের বর্ণনা দিয়েছেন। ১৮৮০ সালে ফরাসি চিকিৎসক চার্লস ল্যাভারান ম্যালেরিয়ার পরজীবী আবিষ্কার করেন, আর ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক রোনাল্ড রস প্রমাণ করেন যে মশা এই রোগ ছড়ায়—এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯০২ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
আজও ম্যালেরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সংক্রামক রোগগুলোর একটি। ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৮.২ কোটি ম্যালেরিয়া কেস এবং ৬.১ লক্ষ মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে । আফ্রিকা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত—বিশ্বের ৯৪% কেস এবং ৯৫% মৃত্যুর জন্য দায়ী । শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ: ২০২৪ সালে প্রায় ৪,৩৮,০০০ আফ্রিকান শিশু ম্যালেরিয়ায় মারা গেছে । প্রতি মিনিটে একজন শিশু ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুবরণ করে ।
ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী পরজীবী হলো Plasmodium—এর মধ্যে P. falciparum সবচেয়ে মারাত্মক এবং আফ্রিকায় সবচেয়ে সাধারণ ।
কেন ম্যালেরিয়া টিকা এত কঠিন?
ম্যালেরিয়া টিকা তৈরি করা ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। এর কারণ:
১. পরজীবীর জটিল জীবনচক্র: ম্যালেরিয়া পরজীবী মশা থেকে মানুষের রক্তে প্রবেশ করে, তারপর লিভারে যায়, সেখানে বংশবৃদ্ধি করে, আবার রক্তে ফিরে এসে লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে। প্রতিটি ধাপে পরজীবী ভিন্ন রূপ ধারণ করে—তাই একটি টিকা দিয়ে সব ধাপ আটকানো কঠিন।
২. অ্যান্টিজেনিক বৈচিত্র্য: ম্যালেরিয়া পরজীবীর পৃষ্ঠে হাজার হাজার ভিন্ন প্রোটিন থাকে, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরজীবীকে চিনতে বিভ্রান্ত হয়।
৩. রোগ প্রতিরোধের স্বল্পস্থায়িত্ব: এমনকি প্রাকৃতিক সংক্রমণের পরও শরীর দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা তৈরি করে না। তাই টিকার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী অনাক্রম্যতা তৈরি করা খুব কঠিন।
এই কারণেই ১৯৬০-এর দশক থেকে গবেষণা শুরু হলেও সফল টিকা আসতে ৬০ বছর লেগেছে।
RTS,S/AS01: প্রথম অনুমোদিত ম্যালেরিয়া টিকা
ইতিহাস
RTS,S-এর গবেষণা শুরু হয় ১৯৮৪ সালে, যখন SmithKline & French (বর্তমান GSK) যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় কাজ শুরু করে । টিকাটি তৈরি হয় সার্কামস্পোরোজয়েট প্রোটিন (CSP) নামক একটি প্রোটিনের অংশ দিয়ে—যা ম্যালেরিয়া পরজীবীর পৃষ্ঠে থাকে এবং লিভারে প্রবেশের আগেই তাকে আটকানোর চেষ্টা করে।
CSP-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ—NANP (অ্যামিনো অ্যাসিডের পুনরাবৃত্তি)—রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য। RTS,S-এ CSP-এর অংশ হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেন (HBsAg)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যাতে শরীর ভালোভাবে সাড়া দেয়। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয় শক্তিশালী AS01 অ্যাডজুভেন্ট ।
কার্যকারিতা
RTS,S-এর ফেজ ৩ ট্রায়ালে দেখা গেছে:
গুরুত্বপূর্ণ হলো, RTS,S লিভারে সংক্রমণ আটকায়—এটি রক্তের ধাপে (erythrocytic stage) কাজ করে না । তাই এটি ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারে না, কিন্তু ক্লিনিক্যাল রোগ প্রতিরোধ করে।
বাস্তব জগতের প্রভাব
২০১৯-২০২৩ সালে ঘানা, কেনিয়া ও মালাউইতে পাইলট কর্মসূচিতে ২০ লক্ষেরও বেশি শিশুকে RTS,S দেওয়া হয় । ফলাফল:
R21/Matrix-M: আরও কার্যকর দ্বিতীয় টিকা
ইতিহাস
R21/Matrix-M তৈরি করেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, আর উৎপাদন করছে সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (SII) । ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে WHO এটি প্রি-কোয়ালিফাই করে ।
R21-এর গঠন RTS,S-এর মতোই—এটিও CSP-ভিত্তিক। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: RTS,S-এ মাত্র ২০% HBsAg CSP-এর সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু R21-এ ১০০% HBsAg যুক্ত । এর ফলে আরও বেশি CSP অ্যান্টিজেন উপস্থাপিত হয় এবং শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ সাড়া তৈরি হয়।
R21-এ ব্যবহৃত হয় Matrix-M অ্যাডজুভেন্ট, যা ডেনড্রিটিক সেল ও T-ফলিকুলার হেল্পার (Tfh) সেল সক্রিয় করে । সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, R21 IgG, IgM, IgA সহ বহুমুখী অ্যান্টিবডি সাড়া তৈরি করে, যা RTS,S-এর চেয়ে বেশি বিস্তৃত ।
কার্যকারিতা
R21-এর ফেজ ২বি ও ফেজ ৩ ট্রায়ালে:
R21-এর কার্যকারিতা RTS,S-এর চেয়ে বেশি এবং এটি শিশুদের মধ্যে আরও অনুকূল নিরাপত্তা প্রোফাইল দেখিয়েছে ।
খরচ ও সরবরাহ
R21-এর দাম প্রতি ডোজ $৩.৯০ (প্রাথমিক) । সিরাম ইনস্টিটিউট বছরে ১০ কোটি ডোজ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে । ২০২৪ সালের জুনে আইভরি কোস্ট প্রথম দেশ হিসেবে R21 চালু করে ।
RTS,S বনাম R21: তুলনা
| বৈশিষ্ট্য | RTS,S/AS01 | R21/Matrix-M |
|---|---|---|
| WHO সুপারিশ | ২০২১ | ২০২৩ |
| অ্যাডজুভেন্ট | AS01 | Matrix-M |
| কার্যকারিতা (১ম বছর) | ~৫৬% | ~৭৫% (মৌসুমি), ~৬৮% (পেরেনিয়াল) |
| গুরুতর ম্যালেরিয়া | ৩০-৪০% | ৭৫% |
| HBsAg ফিউশন | ২০% | ১০০% |
| দাম | বেশি | কম ($৩.৯০/ডোজ) |
| উৎপাদন | সীমিত | বছরে ১০ কোটি ডোজ |
গুরুত্বপূর্ণ: R21 ও RTS,S-এর মধ্যে সরাসরি হেড-টু-হেড ট্রায়াল এখনও হয়নি, তাই কোনো একটি অন্যটির চেয়ে সেরা—এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না পূর্ববর্তী MMR টিকা: তিনটি আলাদা রোগ, একটি সম্মিলিত ঢাল—এল কীভাবে? HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
